প্রাণের ৭১

উঠতি নারী ভারোত্তোলককে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে ফেডারেশনের অফিস সহকারী সোহাগ আলীর বিরুদ্ধে

জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের পুরোনো ভবনে এক উঠতি নারী ভারোত্তোলককে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে ফেডারেশনের অফিস সহকারী সোহাগ আলীর বিরুদ্ধে। এ ঘটনার সূত্রপাত ১৩ সেপ্টেম্বরের হলেও আজ সোমবার ফেডারেশনে এসে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেছেন ওই নারী খেলোয়াড়ের পরিবার।

একজন খেলোয়াড় হলো দেশের অ্যাম্বাসেডর। সে যখন বিদেশে খেলতে যায় তখন দেশের পতাকা বহন করে। কিন্তু সেই ক্রীড়াবিদ যদি অসম্মানিত হন, তাহলে তো দেশেরই অসম্মান। দুঃখের বিষয় সেটিই ঘটেছে। তাও খোদ ফেডারেশনে। বাংলাদেশ ভারোত্তলন ফেডারেশনের একটি কক্ষে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন সোনাজয়ী এক নারী ভারোত্তোলক।

অভিযোগের ভিত্তিতে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ভারোত্তোলন ফেডারেশন। কমিটিতে ফেডারেশনের একজন সহসভাপতি এবং দুজন সদস্যকে রাখা হয়েছে।

ঘটনার পর থেকে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন জাতীয় ক্লাব ভারোত্তোলনে স্বর্ণজয়ী ওই নারী ভারোত্তোলক। তিনি এখন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট হাসপাতালে ভর্তি।

২০১৫ সালে জাতীয় ক্লাব ভারোত্তোলনের সোনাজয়ী এই ভারোত্তোলকের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায়। হতদরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা এই মেয়ে ক্রীড়াঙ্গনে এসেছিলেন অনেক স্বপ্ন নিয়ে। দারিদ্র্য দূর করার একটা উপায় হিসেবে নিয়েছিলেন ভারোত্তোলনকে, পারফরম্যান্স দেখিয়ে একটি চাকরি জোগাড় করতে চেয়েছিলেন।

গেল ১৩ সেপ্টেম্বরের ঘটনা। ভারোত্তোলকের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের পুরনো ভবনের চার তলায় ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ভারোত্তোলন ফেডারেশনের অফিস সহকারী সোহাগ আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে ওই ভারোত্তোলকের পরিবার।

জানা যায়, ১৫ সেপ্টেম্বর খেলা ছিল। এ জন্য ১৩ সেপ্টেম্বর অনুশীলন ছিল। এ সময় চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে আলোচনার জন্য ওই তরুণীকে পুরনো জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের চার তলায় ডেকে নেন সোহাগ আলী। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে একটি রুমে ঢুকিয়ে দরজা আটকে দেওয়া হয়। ধর্ষণের শিকার ওই ভারোত্তোলককে রুমে নিয়ে যেতে কর্মচারী মালেক ও আরেকজন নারী ভারোত্তোলক সহায়তা করেছেন বলে তার পরিবার অভিযোগ করেছে।

ঘটনাটি তার পরিবারের লোকজন জেনেছেন অনেক পরে। বাড়ি ফিরলেও কাউকে কিছু বলেননি ধর্ষণের শিকার ওই নারী ভারোত্তোলক। কিন্তু তিনি মানসিকভাবে প্রচণ্ড ভেঙে পড়েছিলেন। তার আচরণ ও কথাবার্তা অসংলগ্ন হয়ে গিয়েছিল। গেল ১০ অক্টোবর তিনি বাড়ির পেছনের পুকুরে ডুবে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করলে বিষয়টি পরিবারের লোকজন জানতে পারেন।
Add Image
এরপর থেকে গ্রাম্য কবিরাজ দিয়ে চিকিৎসা চলছিল। কিন্তু শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হয়ে পড়লে ২৩ অক্টোবর গ্রাম থেকে ঢাকায় এনে মানসিক হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয় তাকে। এক দিন পরে নেওয়া হয় শয্যায়। সেখানেই এখন চলছে তার চিকিৎসা।

হাসপাতালের কর্তব্যরত একজন চিকিৎসক জানিয়েছেন, প্রচণ্ড মানসিক শক পাওয়ায় এই অবস্থা হয়েছে মেয়েটির। তবে তার অবস্থা এখন উন্নতির পথে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের লবিতে দাঁড়িয়ে নির্যাতিতার মায়ের অভিযোগ, ‘১৩ সেপ্টেম্বর অনুশীলনের কথা বলে ডেকে নিয়ে সোহাগ আমার মেয়ের সর্বনাশ করেছে। সে সকালে গিয়ে প্রায় ৩টা বাজে ফিরে আসে এবং এর পর থেকেই তাকে অস্থির দেখাচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর বলে, আমার শরীর ব্যথা করছে। বলে জ্বরের ওষুধ এনে দিতে। কিন্তু কী হয়েছে কিছু বলে না। অনেক পরে গত ৯ অক্টোবর আমার ফুপাতো ভাইয়ের বউয়ের কাছে সব খুলে বলে।’ এর পরও কেন মামলা করেননি? মায়ের জবাব, ‘আসলে মেয়ের একটা ভবিষ্যৎ আছে। সব কিছু জানাজানি হয়ে গেলে তার ক্ষতি হবে বলে আমরা মামলা-মোকদ্দমার দিকে যাইনি।’

পরদিন থেকেই নির্যাতিতার জীবন একদম ওলটপালট হয়ে যায়। এমন উন্মাদের মতো আচরণ করতে থাকে, গায়ে কোনো কাপড়ও রাখতে চাইত না বলে তাঁর মায়ের দাবি। ওঝা দিয়ে ঝেড়ে, পানিপড়া খাইয়ে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা বৃথা যাওয়ার পর গত ২৩ অক্টোবর এই ভারোত্তোলককে ভর্তি করা হয় জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। এক মাসেরও বেশি সময় হয়ে গেছে ওখানে। ডা. তাজুল ইসলামের অধীনে চিকিৎসা চলছে, বড় ধরনের ‘শক’ থেকে তাঁর এই পাগলপ্রায় অবস্থা হয়েছে বলে মনে করছেন চিকিৎসক। শুরুতে রুগিনীর অবস্থা খুব খারাপ থাকলেও এখন অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। গতকাল ডুকরে কেঁদে উঠে নির্যাতিতার মা বলেছেন, ‘সেদিন সোহাগকে সহায়তা করেছিল মালেক ও উন্নতি (আরেক ভারোত্তোলক)।’ দুই সাহায্যকারী ক্রীড়া পরিষদের কর্মচারী মালেক ও উন্নতি ছুটিতে থাকলেও সোহাগ আলীর দেখা মিলেছে কাল ফেডারেশনে। তাঁর বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ অস্বীকার করে সোহাগ বলেছে, ‘আমি এই নামে (মেয়েটির নাম) কাউকে চিনি না। এখানে কাজ করছি তিন বছর ধরে।’ অথচ ঠিক ওই সময়ে ফেডারেশনে বসা সহসভাপতি উইং কমান্ডার মহিউদ্দিনের কথায় স্পষ্ট তিনি ভারোত্তোলককে চিনতে পারছেন, ‘ওই ভারোত্তোলকের মা ও মামা আজ (কাল) ফেডারেশনে এসেছিল। তাঁদের কথা শুনেছি। ঘটনা সেপ্টেম্বরের হলে এত দিন পরে এসেছে কেন? তবে এই খবর শুনে আমাদের কয়েকজনও হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিল তাকে। যাই হোক, মেয়েটি আগে সুস্থ হয়ে উঠুক। চিকিৎসার জন্য ফেডারেশন থেকে পাঁচ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।’

তাহলে ফেডারেশনের কর্তারা মেয়েটিকে চিনতে পারলেও সোহাগ আলী পুরো সময় ফেডারেশনে কাটিয়ে চিনতে পারছেন না। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা যৌন নির্যাতনের অভিযোগও অস্বীকার করেছেন, ‘আমি কারো সঙ্গে এ রকম করিনি। আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে।’

কিন্তু ভারোত্তোলন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক কর্নেল নজরুল ইসলাম এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে, ‘আমি মেয়েটির ঘটনার কথা শুনেছি। হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছে। আমরা একটা তদন্ত কমিটি গঠন করেছি সহসভাপতি উইং কমান্ডার মহিউদ্দিন সাহেবের নেতৃত্বে, কমিটিতে শাহরিয়া সুলতানা সূচীসহ আরো একজন সদস্য থাকবেন। তাঁরা পুরো ব্যাপারটা তদন্ত করবেন, এরপর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদি কেউ দোষী সাব্যস্ত হয় আমরা তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেব। দেশের প্রচলিত আইনেও শাস্তি হতে পারে। আর তদন্তকালীন সময়ে সোহাগের চাকরি স্থগিত থাকবে।’

এদিকে সামাজিক লজ্জা ও পুলিশি হয়রানির ভয়ে ওই নারী ভারোত্তোলকের পরিবার এখন পর্যন্ত কোনো মামলা দায়ের করেনি। তবে ফেডারেশনে গিয়ে তারা অভিযোগ জানিয়ে এসেছেন। ফেডারেশনের সহসভাপতি উইং কমান্ডার মহিউদ্দিন আহমেদ পুরো বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। এ জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

ফেডারেশন জানিয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত সোহাগের চাকরি স্থগিত থাকবে। এদিকে ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর থেকে উধাও ধর্ষক সোহাগ। রবিবার পর্যন্ত তাকে দেখা গেলেও সোমবার থেকে লাপাত্তা অভিযুক্ত ওই কর্মচারী। এমনকি ফোনেও তাকে পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে ফেডারেশন।






মতামত দিন।

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*