এবার বসুন্ধরার গণমাধ্যম পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি জুলাই আন্দোলনকারীদের
প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের পর এবার বসুন্ধরার গণমাধ্যম পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিল জুলাই আন্দোলনকারীরা। বুধবার (৭ জানুয়ারি) এক সংবাদ সম্মেলনে এই হুমকি দেয় কথিত শিশু জুলাই আন্দোলনকারী তাহরিমা জান্নাত সুরভী। এর আগে একটি চাঁদাবাজির মামলায় সোমবার (৫ জানুয়ারি) দুপুরে গাজীপুরের সিনিয়র ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২ এর বিচারক শুনানি শেষে তার দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ওই দিনই জুলাই জঙ্গিরা মব করে তাকে জেল থেকে বের করে আনেন।
সুরভীকে অপ্রাপ্তবয়স্ক দাবি করে এই রিমান্ড ও গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে আদালত প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করেন জুলাই যোদ্ধারা। জেল থেকে বের হওয়ার পর সংবাদ সম্মেলনে তিনি বসুন্ধরা মিডিয়াকে প্রথম আলোর মতো পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন।
বাংলাদেশে ২০২৫ সাল সাংবাদিকদের জন্য ছিল এক অভাবনীয় ঝুঁকিপূর্ণ সময়। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা যে দ্রুত অবনতির দিকে এগোচ্ছে, সেই বাস্তব চিত্রই এই বছরে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)–এর ২০২৫ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদনে দেখা যায়, জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীদের ওপর হয়রানি, নির্যাতন ও নিপীড়নের অন্তত ৩৮১টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এই পরিসংখ্যান সংবাদমাধ্যমের ওপর চলমান পদ্ধতিগত চাপ এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিসর ক্রমাগত সংকুচিত হওয়ার বাস্তবতা তুলে ধরে। নথিভুক্ত ঘটনাগুলোর মধ্যে ২৩টি ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে—যেখানে সাংবাদিকদের নির্যাতন, হয়রানি কিংবা হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে। এতে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। এ ছাড়া অন্তত ২০ জন সাংবাদিক প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছেন এবং ১২৩ জন সাংবাদিক তাদের পেশাগত কাজের প্রতিশোধ হিসেবে দায়ের করা বিভিন্ন ফৌজদারি মামলার সম্মুখীন হচ্ছেন।
২০২৫ সালে সাংবাদিকদের ওপর শারীরিক সহিংসতার ঘটনাও ছিল উদ্বেগজনক। বিশেষ করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ব্যবহার সাংবাদিক গ্রেপ্তার ও আটক করার একটি নতুন এবং ভয়ংকর দমনমূলক কৌশল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সাংবাদিক মনজুরুল আলম পান্না ও আনিস আলমগীরের গ্রেপ্তার বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে এবং আনিস আলমগীর এখনও কারাবন্দী রয়েছেন, যা সমালোচনামূলক কণ্ঠরোধে আইনের অপব্যবহার নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোও সরাসরি হামলার শিকার হয়েছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার–এর কার্যালয়ে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত জনতা ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ চালিয়েছে। শুধু শারীরিক ধ্বংসযজ্ঞেই সীমাবদ্ধ না থেকে এসব গোষ্ঠী সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং কোন খবর কীভাবে প্রকাশিত হবে তা নির্ধারণ করে দেওয়ার অপচেষ্টা চালিয়েছে।
সম্প্রচার মাধ্যমগুলোর ওপর চাপ আরও প্রকট হয়ে ওঠে যখন জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্স (জেএ) নামের একটি গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে তিনটি টেলিভিশন চ্যানেলের কার্যালয় ঘেরাও করার হুমকি দেওয়ার পর অন্তত তিনজন ব্রডকাস্ট সাংবাদিক চাকরি হারান। তাদের অপরাধ ছিল সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীকে কিছু কঠিন কিন্তু যৌক্তিক প্রশ্ন করা।
এই চিত্রগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের সহিংসতা সংক্রান্ত বিতর্কিত মামলায় গ্রেপ্তার সাংবাদিক ফারজানা রূপা, শাকিল আহমেদ, মোজাম্মেল বাবু ও শ্যামল দত্ত ২০২৫ সালজুড়েই কারাবন্দী ছিলেন। এ ছাড়া শত শত সাংবাদিক এমন সব মামলায় অভিযুক্ত হয়েছেন, যেগুলো মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ভাষায় মিথ্যা কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
সামগ্রিকভাবে, ২০২৫ সালের ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয় যেখানে স্বাধীন সাংবাদিকতাকে গণতন্ত্রের অপরিহার্য ভিত্তি হিসেবে নয়, বরং একটি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
#Bangladesh #BangladeshCrisis
