বিদায়ি উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের স্রোত: চাপে দুর্নীতি দমন কমিশন: মোহাম্মদ হাসান
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে সদ্য বিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির শত শত অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এ জমা পড়ার খবরে রাজনৈতিক অঙ্গন ও জনমনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দায়িত্ব ছাড়ার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে এত বিপুল সংখ্যক লিখিত অভিযোগ দাখিল—এটি যেমন একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, তেমনি এর পেছনের বাস্তবতা ও উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূস দেশের একটি সংকটকালীন সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে গঠিত উপদেষ্টা পরিষদ প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ও নির্বাচনমুখী পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে কাজ করেছে—এমন দাবি ছিল সরকারের পক্ষ থেকে। কিন্তু দায়িত্ব শেষ হওয়ার পরপরই যদি উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির স্রোতধারার মতো অভিযোগ জমা পড়তে থাকে, তবে সেটি নিঃসন্দেহে গভীর অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
দুদকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যে হারে অভিযোগ জমা পড়ছে, তাতে ‘রেকর্ড’ সৃষ্টি হতে পারে। অভিযোগগুলোর একটি বড় অংশে অভিযোগকারীর নাম-পরিচয় উল্লেখ নেই; আবার কিছু অভিযোগে সুনির্দিষ্ট পরিচয় ও লিখিত বক্তব্য সংযুক্ত রয়েছে। এখানে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, নামবিহীন অভিযোগের গ্রহণযোগ্যতা ও প্রাথমিক যাচাই কতটা সম্ভব? দ্বিতীয়ত, পরিচয়যুক্ত অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রে প্রমাণ-সমর্থিত অনুসন্ধান কত দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে করা যাবে?
দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনি কাঠামো অনুযায়ী, যেকোনো লিখিত অভিযোগ যাচাই-বাছাইয়ের জন্য প্রাথমিক অনুসন্ধান প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা যাচাই ছাড়া গণমাধ্যমে প্রচার কিংবা জনমনে সন্দেহ ছড়িয়ে পড়া—উভয়ই আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। আবার অভিযোগকে অবহেলা করাও সমানভাবে অনুচিত।
এখানে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও বিবেচনায় নিতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার সাধারণত নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি নিয়ে দায়িত্ব পালন করে। সেই সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ঢল কি প্রশাসনিক দুর্বলতার ফল, নাকি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বহিঃপ্রকাশ—তা নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া নির্ধারণ করা কঠিন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ ও আইনি প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের নজির নতুন নয়। ফলে প্রতিটি অভিযোগকে প্রমাণভিত্তিক কাঠামোয় মূল্যায়ন করাই হবে রাষ্ট্রীয় সংস্থার দায়িত্বশীল আচরণ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—অভিযোগকারীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা। যাঁরা নাম-পরিচয়সহ অভিযোগ দিয়েছেন, তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একই সঙ্গে মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, যাতে দুদকের প্রক্রিয়া বিশ্বাসযোগ্য থাকে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জবাবদিহিতা কোনো ব্যক্তিবিশেষ বা সরকারের প্রতি বিদ্বেষ নয়; বরং এটি সুশাসনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অভিযোগ উঠলে তদন্ত হবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তদন্ত হতে হবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও সময়োপযোগী। রাজনৈতিক আবেগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপ বা জনমতের ঢেউয়ের ওপর ভর করে নয়; বরং তথ্য-প্রমাণ ও আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে দুদকের সামনে দ্বৈত চ্যালেঞ্জ—একদিকে বিপুল অভিযোগের প্রাথমিক যাচাই, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা অক্ষুণ্ণ রাখা। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ যেমন জরুরি, তেমনি অভিযোগ অসত্য হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মান পুনরুদ্ধার করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অতএব, সদ্য বিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগকে কেন্দ্র করে কোনো তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়। বরং প্রয়োজন ধৈর্য, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এবং আইনের শাসনের প্রতি অবিচল আস্থা। গণমাধ্যমের দায়িত্ব হবে তথ্যনির্ভর ও ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশ করা, যাতে জনমনে বিভ্রান্তি নয়, বরং সচেতনতা সৃষ্টি হয়।
সবশেষে বলা যায়—অভিযোগের সংখ্যা নয়, সত্যের অনুসন্ধানই হোক মূল লক্ষ্য। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান যদি নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতার নীতিতে অবিচল থাকে, তবে অভিযোগের স্রোত নয়, সত্যই শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হবে।
লেখকঃ মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
