প্রাণের ৭১

ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন মুক্তিযুদ্ধের আগুনঝরা দিন থেকে রাজনীতির মঞ্চে: এক স্বপ্নদ্রষ্টার উত্থান -মোহাম্মদ হাসান

চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু নাম সময়ের সীমানা পেরিয়ে মানুষের স্মৃতিতে স্থায়ী হয়ে থাকে। তাঁরা শুধু একটি দলের নেতা নন, তাঁরা হয়ে ওঠেন একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি, একটি অঞ্চলের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ছিলেন তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব—যাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় জড়িয়ে আছে দেশপ্রেম, সংগ্রাম, নেতৃত্ব ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার সঙ্গে।

একজন প্রকৌশলী, মুক্তিযোদ্ধা, শিল্পোদ্যোক্তা এবং রাজনীতিবিদ—এই চারটি পরিচয়ের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল তাঁর দীর্ঘ কর্মময় জীবন। তাঁর কাছে রাজনীতি ছিল কখনো ক্ষমতার সিঁড়ি নয়; বরং মানুষের কল্যাণে কাজ করার একটি দায়িত্ব।
১৯৪৩ সালের ১২ জানুয়ারি চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। শৈশব থেকেই তিনি দেখেছেন শিক্ষা, সমাজ ও দেশ নিয়ে চিন্তাশীল একটি পারিবারিক পরিবেশ। তাঁর পরিবারে ছিল দেশ ও মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধের শিক্ষা, যা পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি তৈরি করে।
উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি প্রকৌশল বিদ্যায় মনোনিবেশ করেন। লাহোরে খনিজ প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনার সময় তিনি শুধু একজন মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবেই পরিচিত ছিলেন না, বরং বাঙালির অধিকার আদায়ের আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়েন।
ষাটের দশকের পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থায় পূর্ব বাংলার মানুষের প্রতি বৈষম্য যখন প্রকট হয়ে উঠছিল, তখন তরুণ মোশাররফ হোসেন ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন। লাহোরে অবস্থান করেও তিনি বাঙালির রাজনৈতিক অধিকার ও স্বাধিকার আন্দোলনের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন।
১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলন বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে সামনে এলে লাহোরে অবস্থানরত বাঙালি শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার ভিত তখনই আরও সুদৃঢ় হয়।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি মিরসরাই আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তরুণ বয়সেই জনগণের আস্থা অর্জন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা আসে ১৯৭১ সালে।
যখন বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে দমিয়ে দিতে পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যার পরিকল্পনা শুরু করে, তখন তিনি একজন জনপ্রতিনিধির নিরাপদ জীবন বেছে নেননি। বরং ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তির সংগ্রামে।
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই প্রকৌশল জ্ঞান, সাহস ও নেতৃত্বের অসাধারণ সমন্বয় ঘটিয়ে তিনি চট্টগ্রামের প্রতিরোধযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে তাঁর দায়িত্ব ছিল শুধু অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করা নয়; বরং যুদ্ধের কৌশল নির্ধারণ, যোদ্ধাদের সংগঠিত করা এবং শত্রুর অগ্রযাত্রা প্রতিহত করার পরিকল্পনা করা।
চট্টগ্রামকে রক্ষা করার সেই প্রথম প্রতিরোধের ইতিহাসে উঠে আসে শুভপুর ব্রিজের নাম—যেখানে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল এক ঐতিহাসিক প্রতিরোধ।
শুভপুর ব্রিজ শুধু একটি স্থাপনা ছিল না; সেটি ছিল চট্টগ্রামের প্রবেশপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থান। পাকিস্তানি বাহিনী যাতে দ্রুত চট্টগ্রামে প্রবেশ করতে না পারে, সেই লক্ষ্যেই তিনি স্থানীয় জনগণ ও মুক্তিকামী মানুষকে সংগঠিত করেন।
সেদিনের সেই সিদ্ধান্ত শুধু একটি সেতু অচল করার ঘটনা ছিল না; এটি ছিল একটি জাতির আত্মরক্ষার আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।
মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল দিনগুলোতে তাঁর নেতৃত্ব, সাহস এবং কৌশলী ভূমিকা চট্টগ্রামের প্রতিরোধ আন্দোলনকে শক্তিশালী করে তোলে। পরবর্তীতে তিনি ভারতে গিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে নেতৃত্ব দেন।
স্বাধীনতার পর তাঁর সামনে ছিল নতুন বাংলাদেশ গড়ার চ্যালেঞ্জ। অস্ত্রের যুদ্ধ শেষ হলেও শুরু হয়েছিল অর্থনৈতিক ও সামাজিক পুনর্গঠনের যুদ্ধ।
একজন প্রকৌশলী হিসেবে তিনি বুঝেছিলেন—দেশের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন শিল্প, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থান। সেই চিন্তা থেকেই তিনি ব্যবসা-বাণিজ্যে যুক্ত হন এবং শিল্প খাতে অবদান রাখেন।
কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে ওঠে মানুষের নেতা হিসেবে।
কারণ তাঁর কাছে রাজনীতি ছিল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক দীর্ঘ যাত্রা।
(চলবে…)
পরবর্তী পর্ব: পর্ব–২ — “শুভপুর ব্রিজের প্রতিরোধ: চট্টগ্রাম রক্ষার এক বীরত্বগাথা”

লেখক: মোহাম্মদ হাসান

সাংবাদিক ও কলামিস্ট।






মতামত দিন।

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*