ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন: স্বপ্ন, সংগ্রাম ও আস্থার এক রাজনৈতিক মহাকাব্য -মোহাম্মদ হাসান
পর্ব–২
শুভপুর ব্রিজের প্রতিরোধ: চট্টগ্রাম রক্ষার এক বীরত্বগাথা
মোহাম্মদ হাসান
১৯৭১ সালের মার্চ। উত্তাল হয়ে উঠেছে সমগ্র বাংলাদেশ। স্বাধিকার আন্দোলনের দাবিতে উত্তাল রাজপথ, মানুষের চোখে স্বাধীনতার স্বপ্ন। অন্যদিকে পাকিস্তানি সামরিক শাসকগোষ্ঠী সেই স্বপ্নকে রক্তের বন্যায় থামিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে ব্যস্ত।
২৫ মার্চের কালরাতে ঢাকায় শুরু হয় ইতিহাসের ভয়াবহতম গণহত্যা। পাকিস্তানি বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর চালায় নির্মম হত্যাযজ্ঞ। সেই হত্যাযজ্ঞের নীলনকশা ছিল দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতেও একই কায়দায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ছিল তাদের বিশেষ লক্ষ্য, কারণ এই শহর ছিল সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সেই সংকটময় মুহূর্তে চট্টগ্রামের প্রতিরোধ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক হিসেবে সামনে আসেন তৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন।
একজন প্রকৌশলী হিসেবে তিনি জানতেন—যুদ্ধে শুধু অস্ত্র নয়, কৌশলও গুরুত্বপূর্ণ। শত্রুর গতিপথ আটকে দেওয়া, তাদের সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত করা এবং প্রতিরোধ গড়ে তোলা ছিল তখন সবচেয়ে জরুরি কাজ।
চট্টগ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রবেশের অন্যতম প্রধান পথ ছিল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের শুভপুর ব্রিজ। ফেনী নদীর ওপর নির্মিত এই সেতু অতিক্রম করেই কুমিল্লা ও ঢাকার দিক থেকে সেনারা চট্টগ্রামের দিকে এগিয়ে আসতে পারত।
ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন উপলব্ধি করেছিলেন, এই সেতুর অগ্রযাত্রা থামানো গেলে পাকিস্তানি বাহিনীর চট্টগ্রামে প্রবেশ বিলম্বিত হবে এবং প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময় পাওয়া যাবে।
যুদ্ধ শুরুর আগেই তিনি এই কৌশলগত পরিকল্পনা করেছিলেন। ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তিনি শুভপুর ব্রিজ অকার্যকর করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন স্মৃতিচারণে উল্লেখ করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু তাঁর সাহসী চিন্তার প্রশংসা করেছিলেন।
২৫ মার্চের ভয়াল রাতের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। চট্টগ্রাম থেকে খবর পেয়ে তিনি ছুটে যান মীরসরাইয়ের দিকে। স্থানীয় জনগণ, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও মুক্তিকামী মানুষকে সংগঠিত করে তিনি শুভপুর ব্রিজ এলাকায় প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
তখন হাতে ছিল না পর্যাপ্ত অস্ত্র কিংবা সামরিক সরঞ্জাম। ছিল শুধু দেশকে মুক্ত করার অদম্য ইচ্ছা। বিস্ফোরকের অভাবে প্রচলিত পদ্ধতিতে ব্রিজ ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। তাই বিকল্প কৌশল গ্রহণ করা হয়।
কেরোসিন, আলকাতরা ও অন্যান্য দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করে ব্রিজের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়। আগুনের লেলিহান শিখা শুধু একটি স্থাপনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, এটি পাকিস্তানি বাহিনীর অগ্রযাত্রার সামনে তৈরি করেছিল বড় বাধা।
শুভপুর ব্রিজে এই প্রতিরোধের ফলে কুমিল্লা থেকে অগ্রসর হওয়া পাকিস্তানি সেনারা নির্ধারিত সময়ে চট্টগ্রামে পৌঁছাতে পারেনি। তাদের দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হয় বাধা অতিক্রম করতে।
এই কয়েক ঘণ্টার বিলম্বই ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই সময়ের মধ্যে চট্টগ্রামের মুক্তিকামী মানুষ সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পায়, বিভিন্ন স্থানে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।
শুভপুরের পর ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় প্রতিরোধ অভিযান পরিচালিত হয়। পাকিস্তানি বাহিনীর চলাচল ব্যাহত করতে অচি মিয়ার ব্রিজ, হিঙ্গুলি ব্রিজ এবং বাড়বকুণ্ড কেমিক্যাল কমপ্লেক্স এলাকার সেতু ধ্বংসের মতো অভিযানে তিনি নেতৃত্ব দেন।
তাঁর প্রকৌশল জ্ঞান মুক্তিযুদ্ধের কৌশল নির্ধারণে বিশেষ ভূমিকা রাখে। একজন মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে তিনি জানতেন, শত্রুর যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল করে দেওয়া একটি কার্যকর সামরিক কৌশল।
মুক্তিযুদ্ধের এক পর্যায়ে পাকিস্তানি বাহিনী চট্টগ্রাম অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলে তিনি ভারতে চলে যান। সেখানে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করা, প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধ পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি সেক্টর–১ এর সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে শুধু সম্মুখযুদ্ধেই অংশ নেননি, বরং গেরিলা অভিযানের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নেও ভূমিকা রাখেন। বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর তিনি আবারও যুদ্ধের মাঠে ফিরে আসেন।
চট্টগ্রাম অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের সময় অস্ত্র ও রসদ সরবরাহের বিভিন্ন পথের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। মীরসরাই, সীতাকুণ্ড ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের কার্যক্রম সমন্বয়ে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হয়েও তিনি যুদ্ধের ময়দান থেকে দূরে থাকেননি। বরং সাধারণ মানুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্বাধীনতার জন্য লড়েছেন।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর যখন বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করে, তখন সেই বিজয়ের পেছনে ছিল অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগ ও সাহসিকতা। সেই ইতিহাসে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের ভূমিকা চট্টগ্রামের প্রতিরোধ অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
স্বাধীনতার পর তিনি শুধু মুক্তিযোদ্ধার পরিচয়ে থেমে থাকেননি। তাঁর সামনে ছিল নতুন দায়িত্ব—ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে একটি নতুন দেশ নির্মাণে অংশ নেওয়া।
মুক্তিযুদ্ধের ময়দান থেকে উন্নয়ন ও রাজনীতির দীর্ঘ পথে তাঁর যাত্রা শুরু হয় নতুন অধ্যায়ে।
(চলবে…)
লেখক: মোহাম্মদ হাসান
সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
পরবর্তী পর্ব:
পর্ব–৩
বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্য থেকে শেখ হাসিনার আস্থা: দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা
