ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন: স্বপ্ন, সংগ্রাম ও আস্থার এক রাজনৈতিক মহাকাব্য -পর্ব–৩
পর্ব–৩
বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্য থেকে শেখ হাসিনার আস্থা: দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা
মোহাম্মদ হাসান:
ইতিহাসের কিছু মানুষ সময়ের প্রয়োজনে সামনে আসেন। তাঁরা শুধু একটি সময়ের সাক্ষী নন, বরং সেই সময়কে নির্মাণেও ভূমিকা রাখেন। ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ছিলেন তেমনই এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব—যাঁর জীবনকে বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হয় বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে, যখন একটি জাতি তার অস্তিত্ব ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করছিল।
একজন প্রকৌশলী হিসেবে তাঁর সামনে ছিল উজ্জ্বল পেশাগত ভবিষ্যৎ। কিন্তু ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে দেশের মানুষের অধিকার ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষাই তাঁকে বেশি টেনেছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন যখন ক্রমশ স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ নিচ্ছিল, তখন তরুণ মোশাররফ হোসেন নিজেকে সেই ইতিহাসের অংশ করে তুলেছিলেন।
ছাত্রজীবনেই রাজনীতির হাতেখড়ি
লাহোরে প্রকৌশল শিক্ষার সময় থেকেই তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার বিকাশ ঘটে। পশ্চিম পাকিস্তানের মাটিতে থেকেও তিনি পূর্ব বাংলার মানুষের প্রতি বৈষম্য, অর্থনৈতিক শোষণ ও রাজনৈতিক বঞ্চনার বিষয়গুলো গভীরভাবে উপলব্ধি করেন।
তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তিনি ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হন। ছাত্রনেতা হিসেবে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা ও নেতৃত্বের গুণ তখনই প্রকাশ পেতে শুরু করে।
১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন ঐতিহাসিক ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন, তখন এটি ছিল বাঙালির মুক্তির সনদ। লাহোরে অবস্থানরত বাঙালি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছয় দফার পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন মোশাররফ হোসেন।
পশ্চিম পাকিস্তানের মাটিতে দাঁড়িয়ে বাঙালির অধিকার নিয়ে কথা বলা তখন সহজ ছিল না। কিন্তু সাহসী এই তরুণ রাজনীতিক কোনো ভয় বা চাপকে গুরুত্ব দেননি। তাঁর বিশ্বাস ছিল—অধিকার আদায়ের সংগ্রাম ন্যায়ের সংগ্রাম।
বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্য ও রাজনৈতিক বিশ্বাসের ভিত্তি
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক দর্শন তরুণ মোশাররফ হোসেনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। বঙ্গবন্ধুর মধ্যে তিনি দেখেছিলেন একজন দূরদর্শী নেতা, যিনি একটি জাতির স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সাহস রাখেন।
১৯৬৯ সালে কক্সবাজারে বঙ্গবন্ধুর সম্মানে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। এরপর আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা আরও দৃঢ় হয়।
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পরিচালিত ছয় দফা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান এবং স্বাধীনতার সংগ্রাম—প্রতিটি অধ্যায়েই তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।
১৯৭০ নির্বাচন: জনগণের আস্থার প্রথম বড় স্বীকৃতি
১৯৭০ সালের নির্বাচন ছিল বাঙালির ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ জনসমর্থন লাভ করে। সেই নির্বাচনে মিরসরাই আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন।
মাত্র ২৭ বছর বয়সে একজন তরুণ প্রকৌশলী ও রাজনীতিক হিসেবে জনগণের এই আস্থা ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বড় অর্জন।
কিন্তু নির্বাচনের পরও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে। শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। সেই সময় তিনি বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে মুক্তির সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
স্বাধীনতা ও রাষ্ট্র নির্মাণের অধ্যায়
মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার পর স্বাধীন বাংলাদেশে শুরু হয় নতুন সংগ্রাম—দেশ পুনর্গঠনের সংগ্রাম।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের ঐতিহাসিক কাজে তিনি অংশগ্রহণ করেন। একজন তরুণ জনপ্রতিনিধি হিসেবে স্বাধীন দেশের মূলনীতি ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো নির্মাণে তাঁর অংশগ্রহণ ছিল গর্বের অধ্যায়।
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে তখন প্রয়োজন ছিল দক্ষ নেতৃত্ব, সংগঠন ও উন্নয়নের পরিকল্পনা। ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন রাজনীতির পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণের চিন্তায় নিজেকে যুক্ত করেন।
১৯৭৫ পরবর্তী কঠিন সময় ও আদর্শের প্রতি অটলতা
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর বাংলাদেশের রাজনীতি এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যায়। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের জন্য নেমে আসে দুর্দিন।
সেই সময়ে অনেকেই রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করলেও ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন নিজের আদর্শ থেকে সরে যাননি। তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে অটুট ছিলেন এবং সংগঠনকে ধরে রাখার কাজে ভূমিকা পালন করেন।
১৯৭৫ সালে তিনি চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বাকশালের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৭ সালে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এরপর ১৯৮০ ও ১৯৮৪ সালে তিনি চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেও তিনি দলকে সংগঠিত করার কাজে নিয়োজিত ছিলেন।
নির্যাতন, হামলা ও সংগ্রামের রাজনীতি
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তাঁকে বহু প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। রাজনীতির মাঠে তিনি যেমন মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন, তেমনি প্রতিপক্ষের হামলারও শিকার হয়েছেন।
১৯৮০ সালে চট্টগ্রামের নিউমার্কেট এলাকায় রাজনৈতিক হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি শেখ হাসিনার মিছিলে সংঘটিত সহিংস ঘটনায় তিনিও আহত হন। ১৯৯২ সালে ফটিকছড়িতে রাজনৈতিক হামলায় গুরুতর আহত হন।
কিন্তু এসব ঘটনা তাঁর রাজনৈতিক পথচলাকে থামাতে পারেনি। বরং তিনি আরও দৃঢ়ভাবে সংগঠন ও মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের অভিভাবক হিসেবে উত্থান
১৯৯২, ১৯৯৬, ২০০৪ ও ২০১২ সালে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। দীর্ঘ সময় ধরে চট্টগ্রামের রাজনীতিতে সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধিতে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর নেতৃত্বে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগ একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি লাভ করে। মাঠপর্যায়ের বহু নেতাকর্মী তাঁর হাত ধরে রাজনীতিতে উঠে আসেন।
শেখ হাসিনার আস্থার রাজনীতিবিদ
বঙ্গবন্ধুর আদর্শে গড়ে ওঠা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের অন্যতম বিশ্বস্ত নেতায় পরিণত হন।
জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর অভিজ্ঞতা, মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক ত্যাগ তাঁকে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিয়ে যায়।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর তিনি দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য নির্বাচিত হন।
এটি ছিল শুধু একটি পদ নয়, বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক ত্যাগ, অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের স্বীকৃতি।
চট্টগ্রামের রাজনীতিতে তিনি ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠানের মতো। তাঁর কাছে রাজনীতি ছিল সম্পর্কের, আস্থার এবং দায়িত্বের জায়গা। তিনি বিশ্বাস করতেন—নেতার সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর মানুষের পাশে থাকা।
একজন মুক্তিযোদ্ধা থেকে একজন জাতীয় নেতা হয়ে ওঠার এই দীর্ঘ পথচলা ছিল ত্যাগ, সংগ্রাম ও বিশ্বাসের পথচলা।
(চলবে…)
পরবর্তী পর্ব:
পর্ব–৪
মন্ত্রীত্ব, উন্নয়ন ও চট্টগ্রামের স্বপ্নপূরণে এক প্রকৌশলী রাজনীতিবিদ
লেখক: মোহাম্মদ হাসান
সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
