প্রাণের ৭১

দুঃসময়ের পরীক্ষায় অবিচল ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন: আদর্শ, আন্দোলন ও ত্যাগের দীর্ঘ অধ্যায়

পর্ব-৪

মোহাম্মদ হাসান

রাজনীতির পথ কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ নয়। এই পথ কখনো নিয়ে আসে মানুষের ভালোবাসা, আবার কখনো বয়ে আনে কঠিন পরীক্ষা, নির্যাতন ও প্রতিকূলতার ঝড়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা পদ-পদবির চেয়ে আদর্শকে বড় করে দেখেছেন, ব্যক্তিগত নিরাপত্তার চেয়ে দলের বিশ্বাস ও জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছেন। ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন তাঁদেরই একজন।

মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিগর্ভ দিন থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংগ্রামের দীর্ঘ পথচলায় তিনি বারবার কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। কখনো রাজপথে, কখনো সাংগঠনিক দায়িত্বে, আবার কখনো রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের সময়—সব জায়গাতেই তিনি নিজের অবস্থানকে দৃঢ় রেখেছেন।

বঙ্গবন্ধুর আদর্শে রাজনীতির পথচলা

প্রকৌশল শিক্ষায় শিক্ষিত, ব্যবসায় সফল একজন মানুষ হয়েও মোশাররফ হোসেন রাজনীতিকে বেছে নিয়েছিলেন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে। ছাত্রজীবনেই তিনি বাঙালির অধিকার আদায়ের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন।

ষাটের দশকে লাহোরে প্রকৌশল শিক্ষার সময় তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ছয় দফা আন্দোলনের পক্ষে জনমত গড়ে তুলেছিলেন। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের মাটিতে দাঁড়িয়ে বাঙালির অধিকার নিয়ে কথা বলা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু তরুণ মোশাররফ হোসেন ভয়কে জয় করে সামনে এগিয়ে গিয়েছিলেন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন ও নেতৃত্ব তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল শুধুমাত্র রাজনৈতিক নয়, ছিল বিশ্বাস ও আদর্শের সম্পর্ক।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে তরুণ বয়সেই তিনি মিরসরাই আসন থেকে নির্বাচিত হন। স্বাধীনতার পূর্ব মুহূর্তে একজন জনপ্রতিনিধি হয়েও তিনি জনগণের পাশে দাঁড়ান এবং মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় নেতৃত্ব দেন।

স্বাধীনতার পর নতুন রাষ্ট্র গঠনের দায়িত্ব

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত, তখন প্রয়োজন ছিল দেশ গড়ার মানুষের। সেই সময়ে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে যুক্ত হন।

১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তরুণ বয়সেই একটি স্বাধীন দেশের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্মাণের কাজে অংশ নেওয়া ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় অধ্যায়।

স্বাধীনতার পর তাঁর সামনে ছিল দুইটি পথ—ব্যক্তিগত উন্নতির পথে এগিয়ে যাওয়া অথবা দেশের মানুষের জন্য রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা। তিনি দ্বিতীয় পথটিই বেছে নেন।

প্রতিকূল সময়ে আদর্শে অটল থাকা

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেমে আসে এক অন্ধকার সময়। সেই সময় অনেকেই রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করলেও ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন নিজের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি।

বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে প্রস্তাব এলেও তিনি নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে সরে আসেননি। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে থেকে তিনি দলকে সংগঠিত করার কাজে মনোযোগ দেন।

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করতে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ সম্পাদক থেকে সভাপতি—বিভিন্ন সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করে তিনি তৃণমূল পর্যায়ে দলকে সংগঠিত করেন।

রাজপথের নির্যাতন ও জীবনসংগ্রাম

রাজনীতি করতে গিয়ে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে বহুবার হামলা ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।

১৯৮০ সালে চট্টগ্রামের নিউমার্কেট এলাকায় রাজনৈতিক হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। ওই ঘটনায় তাঁর পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয়েছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু শারীরিক আঘাত তাঁকে রাজনৈতিক পথ থেকে সরাতে পারেনি।

১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত মিছিলে পুলিশের গুলির ঘটনায় তিনিও আহত হন। ওই ঘটনার পরও তিনি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাঠে সক্রিয় ছিলেন।

১৯৯২ সালে ফটিকছড়িতে রাজনৈতিক হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। বারবার জীবন ঝুঁকির মুখে পড়লেও তিনি রাজনীতি থেকে পিছিয়ে যাননি।

চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের অভিভাবক

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন শুধু একজন নেতা ছিলেন না, চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের একজন অভিভাবক হিসেবেও পরিচিতি লাভ করেন।

তাঁর হাত ধরে চট্টগ্রাম উত্তর জেলার অসংখ্য তরুণ রাজনীতিতে উঠে আসেন। সংগঠন পরিচালনা, কর্মীদের মূল্যায়ন এবং রাজনৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ ভূমিকা রাখেন।

সহকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন পরামর্শদাতা, কর্মীদের কাছে ছিলেন আস্থার জায়গা।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আস্থার প্রতীক

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে গড়ে ওঠা এই রাজনীতিবিদ পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য থেকে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম প্রেসিডিয়ামের সদস্য—প্রতিটি দায়িত্বে তিনি সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারে তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা ও প্রকৌশল জ্ঞান কাজে লাগে।

শেষ কথা

একজন রাজনীতিবিদের মূল্যায়ন শুধু তাঁর পদ-পদবি দিয়ে হয় না; মূল্যায়ন হয় তাঁর সংকটে অবস্থান, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং আদর্শের প্রতি অবিচল থাকার মাধ্যমে।

ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের রাজনৈতিক জীবন সেই ধারারই একটি উদাহরণ—যেখানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সংগঠনের প্রতি দায়িত্ব, জনগণের প্রতি ভালোবাসা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও দৃঢ় থাকার গল্প রয়েছে।

পরবর্তী পর্ব–৫:
“উন্নয়নের স্থপতি মোশাররফ হোসেন: মন্ত্রিত্ব, অবকাঠামো ও মিরসরাইয়ের নতুন স্বপ্ন”

লেখক: মোহাম্মদ হাসান
সাংবাদিক ও কলামিস্ট।






মতামত দিন।

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*