সবাই রাজনীতিবিদ হলে দেশ গড়বে কারা?
ক্ষমতাকেন্দ্রিক সংস্কৃতির বিস্তার, মেধার অপচয় ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সংকট
লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
রাজনীতি একটি দেশের রাষ্ট্র পরিচালনা, জনকল্যাণ ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণে রাজনীতির ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু রাজনীতি যখন জনসেবার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে ক্ষমতা, প্রভাব, অর্থ ও ব্যক্তিস্বার্থ অর্জনের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন তা রাষ্ট্রের জন্য আশীর্বাদের বদলে বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের সমসাময়িক বাস্তবতায় রাজনীতিকেন্দ্রিক এই ক্ষমতার সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। প্রশ্ন হলো—একটি দেশের অধিকাংশ তরুণ যদি রাজনীতির মাধ্যমে ক্ষমতা অর্জনের স্বপ্ন দেখে, তবে দেশ গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ মানুষ তৈরি করবে কারা?
ক্ষমতার মোহে হারিয়ে যাচ্ছে সম্ভাবনা
আমাদের সমাজে রাজনৈতিক পরিচয় অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতা, দক্ষতা ও পেশাগত সাফল্যের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। কার সঙ্গে ওঠাবসা, কোন দলের অনুসারী কিংবা কার কতটা প্রভাব—এসব পরিচয় কখনো কখনো মানুষের সামাজিক অবস্থান নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। ফলে একশ্রেণির তরুণের কাছে পড়াশোনা, গবেষণা, কারিগরি দক্ষতা কিংবা উদ্যোক্তা হওয়ার চেয়ে রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়া অধিক আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
এই প্রবণতার পেছনে রয়েছে দ্রুত পরিচিতি অর্জন, ক্ষমতাবানদের সান্নিধ্য এবং প্রভাব বিস্তারের প্রত্যাশা। অথচ রাজনীতিতে প্রবেশ করা প্রত্যেক তরুণের জন্য সম্মানজনক ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং আদর্শিক চর্চার পরিবর্তে চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, টেন্ডারবাজি ও পেশিশক্তির প্রতিযোগিতা প্রাধান্য পেলে তরুণদের একটি অংশ বিপথগামী হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা হারালে কিংবা ক্ষমতার সমীকরণ বদলে গেলে তাদের অনেকেই অনিশ্চয়তা, হতাশা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মুখোমুখি হয়।
তবে সমস্যার দায় সব তরুণের ওপর চাপানো যাবে না। ছাত্ররাজনীতি বহু সময় নেতৃত্ব, অধিকার আদায় ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল। সংকট তৈরি হয় তখনই, যখন সংগঠন আদর্শের পরিবর্তে ব্যক্তিস্বার্থের অধীন হয়ে পড়ে এবং শিক্ষাঙ্গন জ্ঞানচর্চার বদলে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়।
রাজনীতির বাইরে যে জীবন, তার গুরুত্ব কোথায়?
একটি রাষ্ট্র কেবল রাজনৈতিক নেতাদের দিয়ে পরিচালিত হয় না। রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেন চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, বিজ্ঞানী, গবেষক, কৃষিবিদ, প্রযুক্তিবিদ, উদ্যোক্তা, দক্ষ শ্রমিক, লেখক ও সংস্কৃতিকর্মীরা। তাঁদের সম্মিলিত শ্রমেই তৈরি হয় জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি, উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা, আধুনিক শিল্প এবং কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামো।
কিন্তু সমাজে যখন রাজনৈতিক পরিচয়কে সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তখন অন্যান্য পেশার প্রতি আগ্রহ ও সম্মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একজন মেধাবী শিক্ষার্থী গবেষক হওয়ার পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রভাব অর্জনকেই জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিলে তা শুধু ব্যক্তিগত সম্ভাবনার অপচয় নয়; দেশের জন্যও একটি সুযোগ হারানো।
প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে প্রতিযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, আধুনিক চিকিৎসা, কৃষি উদ্ভাবন ও শিল্প উৎপাদনে দক্ষতা ছাড়া কোনো দেশের টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়। প্রয়োজনীয় দক্ষতা দেশে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হলে বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে, যা অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।
শিক্ষাঙ্গন কি রাজনীতির পরীক্ষাগার, নাকি ক্ষমতার মঞ্চ?
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হওয়া উচিত মুক্তচিন্তা, যুক্তিবাদ, মানবিক মূল্যবোধ ও নেতৃত্ব বিকাশের কেন্দ্র। সেখানে শিক্ষার্থীরা রাজনীতি সম্পর্কে জানবে, রাষ্ট্রের নীতি নিয়ে বিতর্ক করবে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে এবং গণতান্ত্রিক আচরণ শিখবে। কিন্তু রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড যখন শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করে, তখন তার ক্ষতি বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে।
আজ অনেক অভিভাবক সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে তাকে রাজনৈতিক সংঘাত থেকে দূরে থাকতে বলেন। তাঁদের এই উদ্বেগকে নিছক রাজনীতিবিরোধিতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি শিক্ষাঙ্গলে নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে সমাজের প্রত্যাশার প্রতিফলন।
সমাধান অবশ্য ছাত্ররাজনীতি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া নয়। প্রয়োজন এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, সংগঠনের ভেতরে গণতন্ত্র চর্চা হবে এবং কোনো শিক্ষার্থীকে দলীয় পরিচয়ের কারণে হয়রানি বা বৈষম্যের শিকার হতে হবে না। শিক্ষাঙ্গলে সহিংসতা, দখলদারিত্ব ও অপরাধের বিরুদ্ধে দলনির্বিশেষে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
পরিবর্তনের জন্য করণীয়
প্রথমত, রাজনীতিকে ক্ষমতা অর্জনের সিঁড়ি নয়, জনসেবার দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নিজেদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে যে সততা, দক্ষতা ও জনকল্যাণই নেতৃত্বের প্রকৃত মানদণ্ড।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষাব্যবস্থায় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা, সাহিত্য, কারিগরি শিক্ষা ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের সুযোগ বাড়াতে হবে। তরুণদের এমন পরিবেশ দিতে হবে, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়াও যোগ্যতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে সম্মানজনক অবস্থান অর্জন করা সম্ভব।
তৃতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাব ও সহিংসতা থেকে সুরক্ষিত রেখে শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে তরুণেরা বাস্তবসম্মত ভবিষ্যৎ দেখতে পায়।
চতুর্থত, পরিবার ও সমাজকে পেশাগত বৈচিত্র্যের মর্যাদা দিতে হবে। একজন সৎ শিক্ষক, দক্ষ চিকিৎসক কিংবা উদ্ভাবনী বিজ্ঞানীও জাতির জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ—কখনো কখনো তাঁদের অবদান দীর্ঘ মেয়াদে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের চেয়েও গভীর প্রভাব ফেলে।
রাষ্ট্র গড়তে চাই বহুমাত্রিক নেতৃত্ব
রাজনীতি প্রয়োজন, রাজনৈতিক নেতৃত্বও প্রয়োজন। কিন্তু রাজনীতির সুস্থ বিকাশের জন্য প্রয়োজন জ্ঞান, নৈতিকতা, পেশাগত দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি। যে রাজনীতি দক্ষ মানুষ তৈরি করতে উৎসাহ দেয়, সেটিই রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে। বিপরীতে, যে রাজনীতি সব প্রতিভাকে নিজের বলয়ে টেনে নিতে চায়, তা শেষ পর্যন্ত সমাজকে দুর্বল করে।
মনে রাখতে হবে, একজন দক্ষ রাজনীতিবিদ রাষ্ট্রের নীতিগত দিকনির্দেশনা দিতে পারেন; কিন্তু হাসপাতাল পরিচালনা, সেতু নির্মাণ, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন, শিক্ষার মানোন্নয়ন কিংবা অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের দক্ষ মানুষ।
তাই তরুণদের সামনে একটিমাত্র সাফল্যের পথ তুলে ধরা বন্ধ করতে হবে। রাজনীতি হবে সম্ভাবনার একটি পথ, একমাত্র গন্তব্য নয়। কারণ সবাই যদি ক্ষমতার কেন্দ্রের দিকে ছুটে চলে, তবে জ্ঞান, উৎপাদন ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রগুলো শূন্য হয়ে পড়বে।
দেশের ভবিষ্যৎ শুধু কে ক্ষমতায় যাবে, তার ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে ক্ষমতার বাইরে কতজন দক্ষ, সৎ ও সৃজনশীল মানুষ তৈরি হচ্ছে, তার ওপরও। এখনই সময় ক্ষমতার মোহের বদলে যোগ্যতার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করার। রাজনীতির পাশাপাশি বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, শিক্ষক, প্রকৌশলী ও গবেষক তৈরির সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলেই গড়ে উঠবে ভারসাম্যপূর্ণ, সমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভর বাংলাদেশ।
