প্রাণের ৭১

রাজনৈতিক সংকটঃ মোহাম্মদ হাসান

মোহাম্মদ হাসান
সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সংকট মানুষের জীবনের নতুন কোনো শব্দ নয়। কখনো সংকট আসে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়ে, কখনো অর্থনৈতিক মন্দা হয়ে, কখনো জ্বালানি ও খাদ্যের চাপ হয়ে; আবার কখনো সংকট তৈরি হয় রাজনীতির অস্থিরতা থেকে। কিন্তু রাজনৈতিক সংকটের অভিঘাত অন্য সব সংকটের চেয়ে গভীর। কারণ রাজনীতি যখন অস্থির হয়, তখন তার প্রভাব পড়ে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি, মানুষের নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং সর্বোপরি নাগরিকের ভবিষ্যৎ ভাবনায়।

বাংলাদেশ আজ এমন এক সময় অতিক্রম করছে, যখন রাজনৈতিক বাস্তবতা গভীরভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের পর রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন, অন্তর্বর্তী শাসন, পরবর্তী নির্বাচন, নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হওয়ার বাস্তবতা—সব মিলিয়ে দেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায় তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াও চলমান।

এই বাস্তবতা এড়িয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটকে বোঝা সম্ভব নয়।

তবে ইতিহাসের একটি শিক্ষা কখনো ভুলে গেলে চলবে না—কোনো রাজনৈতিক দলকে শুধু ক্ষমতার পালাবদলের হিসাব দিয়ে বিচার করলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়। একটি রাজনৈতিক দলের জন্ম, সংগ্রাম, ভুল-ত্রুটি, অর্জন, গণমানুষের সঙ্গে সম্পর্ক এবং রাষ্ট্র নির্মাণে তার ভূমিকা—সবকিছুকেই ইতিহাসের দীর্ঘ পরিসরে দেখতে হয়।

আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতির এমনই একটি ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান। ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সঙ্গে দলটির ইতিহাস গভীরভাবে যুক্ত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে যে রাজনৈতিক সংগ্রাম স্বাধীনতার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিল, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

কিন্তু ইতিহাস যেমন অর্জনকে স্মরণ করে, তেমনি ভুলের হিসাবও চায়।

সুতরাং আজকের রাজনৈতিক সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হলে শুধু কে ক্ষমতায় থাকবে, কে বিরোধী দলে থাকবে—এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়। প্রশ্ন হতে হবে, রাষ্ট্র কীভাবে জনগণের আস্থা ফিরে পাবে? রাজনীতি কীভাবে মানুষের কাছে আবার আশার জায়গা হয়ে উঠবে?

রাজনীতি যখন মানুষের কাছে ভয়ের কারণ

রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য রাষ্ট্র পরিচালনা, জনগণের অধিকার রক্ষা এবং মানুষের জীবনমান উন্নত করা। কিন্তু রাজনীতি যদি মানুষের কাছে নিরাপত্তার পরিবর্তে আতঙ্কের প্রতিশব্দ হয়ে ওঠে, তাহলে সেখানে রাজনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজন অনিবার্য হয়ে পড়ে।

আজ মানুষের বড় উদ্বেগ জীবনের মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে। জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্প ও উৎপাদন খাত চাপের মুখে পড়ছে, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। সেপ্টেম্বরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার মধ্যে বাংলাদেশে ডিজেল ও পেট্রোলের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে।

একজন সাধারণ মানুষের কাছে এসব সংকটের রাজনৈতিক ব্যাখ্যার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো—তার সংসার কীভাবে চলবে, সন্তানের পড়াশোনা কীভাবে হবে, চাকরি থাকবে কি না, ব্যবসা টিকে থাকবে কি না।

রাজনীতি যদি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব আরও বাড়বে।

আওয়ামী লীগের জন্য সংকটের অর্থ কী?

আওয়ামী লীগের বর্তমান সংকটকে শুধু একটি দলের ক্ষমতা হারানোর ঘটনা হিসেবে দেখলে এর গভীরতা বোঝা যাবে না। দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বর্তমানে নিষিদ্ধ এবং এর বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া চলছে। একই সঙ্গে দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।

আওয়ামী লীগের জন্য এই সময় তাই আত্মসমালোচনারও সময়।

আওয়ামী লীগের শক্তি ঐতিহাসিকভাবে তার সংগঠন, জনগণের সঙ্গে দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্ক এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে তার পরিচয়ের মধ্যে নিহিত। কিন্তু সেই শক্তিকে ভবিষ্যতের রাজনীতিতে কার্যকর করতে হলে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া, সাংগঠনিক দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের প্রশ্ন সামনে আনতেই হবে।

রাজনীতি কখনো শুধু স্লোগানে টিকে থাকে না। রাজনীতি টিকে থাকে মানুষের বিশ্বাসে।

আর মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে হলে মানুষের কাছে যেতে হয়, মানুষের কথা শুনতে হয়, নিজের ভুল স্বীকার করার সাহস থাকতে হয় এবং ভিন্নমতকে রাজনৈতিক শত্রু হিসেবে না দেখে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে হয়।

বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির মূল শিক্ষা

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল মানুষের সঙ্গে তাঁর সংযোগ। তিনি রাজনীতিকে কেবল ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে দেখেননি; দেখেছেন মানুষের অধিকার, আত্মমর্যাদা ও মুক্তির প্রশ্ন হিসেবে।

সেই কারণেই আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে গেলে শুধু অতীতের গৌরবের কথা বললেই হবে না। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনের যে মানবিক ও গণমুখী দিক—তা কতটা বাস্তব জীবনে প্রতিষ্ঠিত করা যায়, সেটিই বড় প্রশ্ন।

‘সোনার বাংলা’ শুধু একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি এমন একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন, যেখানে মানুষ নিরাপদ থাকবে, ন্যায়বিচার পাবে, কাজের সুযোগ পাবে এবং নিজের মত প্রকাশের অধিকার ভোগ করবে।

তাই আওয়ামী লীগের জন্য নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার অর্থ হতে পারে—ইতিহাসকে ধারণ করা, কিন্তু ইতিহাসের ভুলকে অস্বীকার না করা।

বিরোধী মত মানেই শত্রু নয়

গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো ভিন্নমত। যে সমাজে প্রশ্ন করা যায় না, সেখানে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। যে রাষ্ট্রে সমালোচনার জায়গা সংকুচিত হয়, সেখানে ভুল সংশোধনের পথও সংকুচিত হয়।

বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়, প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার রাজনৈতিক সংস্কৃতি শেষ পর্যন্ত কাউকেই স্থায়ী নিরাপত্তা দেয় না।

আজ যে ক্ষমতায়, কাল সে বিরোধী হতে পারে। আজ যে বিরোধী, কাল সে ক্ষমতায় আসতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র সবার।

এই সহজ সত্যটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যত দ্রুত প্রতিষ্ঠিত হবে, রাজনৈতিক সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পথ ততই প্রশস্ত হবে।

তরুণ প্রজন্মের কাছে আমরা কী রেখে যাচ্ছি?

আজকের তরুণেরা রাজনীতিকে কীভাবে দেখছে—এই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তারা এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চায় যেখানে যোগ্যতা কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ থাকবে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে এবং রাজনৈতিক পরিচয় কারও ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না।

সাম্প্রতিক বছরগুলোর আন্দোলনগুলো দেখিয়েছে, তরুণ সমাজ তাদের অধিকার ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সচেতন। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে নিরাপদ সড়কের দাবি—বিভিন্ন সময়ে তরুণেরা রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে প্রশ্ন তুলেছে।

এই প্রশ্নগুলোকে শুধু রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর ভেতরে রয়েছে একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ।

তাই রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—তরুণদের কেবল মিছিলের মানুষ হিসেবে নয়, রাষ্ট্র নির্মাণের অংশীদার হিসেবে দেখা।

সংকটের সময়ে নেতৃত্বের পরীক্ষা

সংকটের সময়ে নেতৃত্বের আসল পরিচয় পাওয়া যায়।

সুবিধার সময়ে নেতৃত্ব দেওয়া সহজ; কঠিন সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত রাজনৈতিক দায়িত্ব। রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের তাই শুধু ক্ষমতার সমীকরণ নয়, মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তবতা নিয়েও কথা বলতে হবে।

জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, শিল্পের উৎপাদন, কৃষকের উৎপাদন খরচ, শিক্ষিত তরুণের চাকরি—এসবই আজকের রাজনীতির কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হওয়া প্রয়োজন।

কারণ ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে রাজনৈতিক বক্তৃতার চেয়ে এক কেজি চালের দাম গুরুত্বপূর্ণ। বেকার তরুণের কাছে দলীয় পদ-পদবির চেয়ে একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কাছে রাজনৈতিক স্লোগানের চেয়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও স্থিতিশীল বাজার গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনীতি মানুষের এই বাস্তবতাকে বুঝতে না পারলে রাজনীতি থেকে মানুষ দূরে সরে যাবে।

সামনে পথ একটাই—গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাজনীতি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের সমাধান কোনো একক দল, ব্যক্তি বা সরকারের হাতে নেই। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টা।

প্রতিহিংসার পরিবর্তে সহনশীলতা, দখলের পরিবর্তে প্রতিযোগিতা, ভয় দেখানোর পরিবর্তে যুক্তি, গুজবের পরিবর্তে তথ্য এবং ব্যক্তিপূজার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠান—এই পরিবর্তনগুলোই হতে পারে সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি।

আওয়ামী লীগের জন্যও সামনে প্রশ্নটি খুব স্পষ্ট—ঐতিহাসিক পরিচয়কে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গে কীভাবে যুক্ত করা হবে?

শুধু ‘আমরা কী করেছি’ বললে হবে না; জনগণ জানতে চাইবে—‘আগামী দিনে আমরা কী করব?’

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে বাস্তব কর্মসূচিতে।

শেষ কথা

রাজনৈতিক সংকট কোনো দেশের শেষ অধ্যায় নয়। বরং সংকট কখনো কখনো নতুন রাজনৈতিক বোধ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে সংকট এসেছে বহুবার। ভাষার অধিকার নিয়ে সংকট এসেছে, স্বাধিকারের প্রশ্নে সংকট এসেছে, মুক্তিযুদ্ধ এসেছে, গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম এসেছে। প্রতিবারই জনগণ ইতিহাসের নতুন অধ্যায় রচনা করেছে।

আজও প্রয়োজন সেই জনগণের শক্তিকে সম্মান করার।

আওয়ামী লীগের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার যে দীর্ঘ সংগ্রাম রয়েছে, তার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলতে হয়—ভবিষ্যতের রাজনীতি অতীতের গৌরবের পাশাপাশি আত্মসমালোচনার সাহসও দাবি করে।

রাজনীতি যদি মানুষের জন্য হয়, তবে মানুষের কণ্ঠ শুনতে হবে।
রাজনীতি যদি গণতন্ত্রের জন্য হয়, তবে ভিন্নমতকে জায়গা দিতে হবে।
আর রাজনীতি যদি বাংলাদেশের জন্য হয়, তবে ক্ষমতার আগে মানুষকে রাখতে হবে।

সংকট আসবেই। রাজনৈতিক পালাবদলও আসবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইতিহাস সেই রাজনীতিকেই মূল্যায়ন করবে, যে রাজনীতি ক্ষমতার চেয়েও মানুষের মর্যাদাকে বড় করে দেখেছে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তাই কোনো একক দলের হাতে নয়—ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আমরা কেমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করতে পারি, তার ওপর।

মানুষের রাজনীতি ফিরে আসুক। গণতন্ত্র শক্তিশালী হোক। বাংলাদেশ এগিয়ে যাক।

লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট, সাবেক ছাত্রনেতা।






মতামত দিন।

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*