প্রাণের ৭১

সামাজিক অবক্ষয়: নৈতিকতার সংকট ও মানবিক সমাজ গঠনের চ্যালেঞ্জ

মোহাম্মদ হাসান

একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মাধ্যমে পরিমাপ করা যায় না। একটি জাতির প্রকৃত উন্নয়নের অন্যতম প্রধান সূচক হলো তার মানুষের নৈতিকতা, মানবিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধ। যখন একটি সমাজে সততা, সহানুভূতি, ন্যায়বোধ, দায়িত্বশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার জায়গা সংকুচিত হতে থাকে, তখন সেই সমাজ ধীরে ধীরে সামাজিক অবক্ষয়ের দিকে এগিয়ে যায়। আজকের বাংলাদেশেও এই সংকট নানা রূপে দৃশ্যমান, যা গভীর উদ্বেগের বিষয়।

বর্তমান সময়ে আমরা এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে দুর্নীতি, প্রতারণা, সহিংসতা, নারী ও শিশু নির্যাতন, মাদকাসক্তি, কিশোর অপরাধ, যৌন হয়রানি এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। এমন অনেক ঘটনা প্রতিদিন আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়, কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই সেগুলো নতুন ঘটনার আড়ালে চাপা পড়ে যায়। এতে বোঝা যায়, সমস্যা কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু অপরাধ নয়; বরং সমাজের ভেতরে মূল্যবোধের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ছে।

পরিবার একসময় ছিল নৈতিক শিক্ষার প্রথম বিদ্যালয়। বাবা-মায়ের আচরণ, পারিবারিক শৃঙ্খলা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং ধর্মীয় ও মানবিক শিক্ষার মধ্য দিয়েই শিশুর চরিত্র গড়ে উঠত। কিন্তু আধুনিক ব্যস্ত জীবন, পারিবারিক বন্ধনের শৈথিল্য এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রার কারণে সেই পরিবেশ অনেকাংশেই বদলে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে সন্তানদের সঙ্গে পরিবারের মানসিক যোগাযোগ কমে যাচ্ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব তাদের ব্যক্তিত্ব ও মূল্যবোধের ওপর পড়ছে।

অন্যদিকে ভোগবাদী মানসিকতার বিস্তার সামাজিক অবক্ষয়কে আরও ত্বরান্বিত করছে। অর্থ, ক্ষমতা ও প্রভাব অর্জনের প্রতিযোগিতায় অনেকেই নৈতিকতা ও বিবেককে বিসর্জন দিচ্ছেন। সমাজে সফলতার মানদণ্ড হিসেবে চরিত্রের পরিবর্তে সম্পদ ও ক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে অসৎ পথেও সফল হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে, যা তরুণ সমাজের কাছেও ভুল বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে।

প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের জীবনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। তবে এর অপব্যবহারও উদ্বেগজনক। গুজব, বিদ্বেষমূলক প্রচারণা, কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট, সাইবার বুলিং এবং অসুস্থ প্রতিযোগিতা সমাজে বিভ্রান্তি ও অসহিষ্ণুতা বাড়াচ্ছে। অনেক তরুণ বাস্তব সামাজিক সম্পর্কের পরিবর্তে ভার্চুয়াল জগতে অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যা তাদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, কিশোর গ্যাং, প্রেমে প্রত্যাখ্যানের জেরে হত্যাকাণ্ড, পারিবারিক সহিংসতা এবং আত্মহত্যার মতো ঘটনাগুলো উদ্বেগজনকভাবে সামনে এসেছে। বহু ঘটনায় দেখা যায়, অপরাধীরা প্রভাবশালী হওয়ায় ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেন, কিংবা অনেক ঘটনাই প্রকাশ্যে আসে না। বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধপ্রবণতাকে আরও উৎসাহিত করে এবং সাধারণ মানুষের আইনের প্রতি আস্থা দুর্বল করে দেয়।

শিক্ষা ব্যবস্থার দিকেও আমাদের নতুন করে দৃষ্টি দিতে হবে। পরীক্ষার ফলাফল কিংবা পেশাগত দক্ষতা অর্জনই শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না। একজন শিক্ষার্থীকে একজন দায়িত্বশীল, নৈতিক ও মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাও শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য। নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক দায়বদ্ধতা, সহনশীলতা এবং নাগরিক মূল্যবোধকে পাঠ্যক্রম ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।

গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা, তথ্য যাচাই, ইতিবাচক উদাহরণ তুলে ধরা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এসব মাধ্যম সমাজ পরিবর্তনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে নেতিবাচক ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিস্তার রোধেও সক্রিয় উদ্যোগ প্রয়োজন।

সামাজিক অবক্ষয় রোধে রাষ্ট্র, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন এবং নাগরিক সমাজ—সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। পরিবারে নৈতিক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানবিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে। আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো অপরাধী প্রভাব বা ক্ষমতার কারণে দায়মুক্তি না পায়। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক সচেতনতা, স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ এবং মানবিক মূল্যবোধভিত্তিক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

সবশেষে বলা যায়, সামাজিক অবক্ষয় কোনো একদিনে সৃষ্টি হয়নি, তাই এর সমাধানও তাৎক্ষণিক সম্ভব নয়। তবে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবার সম্মিলিত উদ্যোগে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। পরিবর্তনের শুরু হতে হবে নিজের ভেতর থেকে। কারণ একজন সৎ, দায়িত্বশীল ও মানবিক মানুষই একটি সুন্দর পরিবার গড়ে তোলে; সুন্দর পরিবার গড়ে তোলে আদর্শ সমাজ; আর আদর্শ সমাজই গড়ে তোলে একটি সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্র।

মানুষ হিসেবে আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় মানুষ হওয়া। তাই আসুন, প্রতিযোগিতার আগে বিবেককে, ক্ষমতার আগে মানবিকতাকে এবং স্বার্থের আগে সমাজের কল্যাণকে গুরুত্ব দিয়ে একটি নৈতিক, নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গঠনে প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করি।

লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।






মতামত দিন।

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*