প্রাণের ৭১

কর্মহীনতার বিস্তার: অর্থনৈতিক সংকট থেকে সামাজিক অস্থিরতার শঙ্কা

-মোহাম্মদ হাসান

কর্মসংস্থান একটি দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি, সামাজিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি এবং মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অন্যতম প্রধান শর্ত। একটি অর্থনীতি কতটা শক্তিশালী, তা শুধু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) কিংবা প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে বিচার করা যায় না; বরং সেই অর্থনীতি কত মানুষের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করছে, মানুষের আয় কতটা বাড়াচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কতটা নিশ্চয়তা দিতে পারছে, তা দিয়েও এর সক্ষমতা পরিমাপ করতে হয়। বাংলাদেশের বর্তমান শ্রমবাজারের বাস্তবতায় কর্মসংস্থানের প্রশ্নটি তাই নতুন করে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

দেশে সরকারি হিসাবেই বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখের বেশি। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হারও উদ্বেগজনক। অন্যদিকে শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বিনিয়োগে স্থবিরতার আশঙ্কা শ্রমবাজারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। এর প্রভাব পড়ছে শ্রমিক, চাকরিপ্রত্যাশী তরুণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর ওপর।

কর্মসংস্থানের এই সংকটকে শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখলে এর পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে না। দীর্ঘস্থায়ী কর্মহীনতা মানুষের জীবনযাত্রা, পারিবারিক সম্পর্ক, মানসিক স্থিতি ও সামাজিক নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করতে পারে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও হতাশা সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। তবে অপরাধের পেছনে বেকারত্বই একমাত্র কারণ নয়; বৈষম্য, মাদক, অপরাধী চক্র, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সুতরাং কর্মসংস্থান সংকটকে অর্থনীতি, সমাজ ও জননিরাপত্তার পারস্পরিক সম্পর্কের আলোকে বিশ্লেষণ করা জরুরি।

### বেকারত্বের পরিসংখ্যানের আড়ালে শ্রমবাজারের বাস্তবতা

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্যা ছিল প্রায় ২৬ লাখ ২০ হাজার। একই সময়ে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছায়। উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পরও বিপুলসংখ্যক তরুণের কর্মসংস্থান না পাওয়া দেশের শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে বিদ্যমান অসংগতিকে সামনে নিয়ে আসে।

তবে বেকারত্বের সরকারি হার দিয়ে শ্রমবাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে হওয়ায় বহু মানুষ দৈনিক মজুরি, অস্থায়ী কাজ কিংবা অনিশ্চিত আয়ের ওপর নির্ভর করে জীবন চালান। পরিসংখ্যানের হিসাবে তাঁরা কর্মরত হলেও তাঁদের অনেকেরই স্থায়ী আয়, চাকরির নিশ্চয়তা কিংবা সামাজিক সুরক্ষা নেই।

এ কারণে বেকারের সংখ্যা জানার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের মান, মজুরি, কর্মঘণ্টা, উৎপাদনশীলতা এবং আয় দিয়ে ন্যূনতম জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোর সক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে। শুধু কাজের সুযোগ তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; সেই কাজ হতে হবে নিরাপদ, উৎপাদনশীল ও মর্যাদাপূর্ণ।

### শিল্পকারখানা বন্ধ: সংকুচিত হচ্ছে কর্মসংস্থানের পরিসর

শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ার তাৎক্ষণিক আঘাত পড়ে শ্রমিকের ওপর। কিন্তু এর প্রভাব একটি প্রতিষ্ঠানের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকে না; ছড়িয়ে পড়ে পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়।

একজন শ্রমিক চাকরি হারালে তাঁর পরিবারের খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও সন্তানের শিক্ষার ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। আয় কমে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারে কেনাকাটা কমে যায়। এর প্রভাব পড়ে দোকানি, পরিবহনশ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন সেবাখাতের মানুষের ওপরও। ফলে একটি কারখানা বন্ধ হওয়ার ঘটনা বৃহত্তর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সংকুচিত করতে পারে।

২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ৩৫৩টি কারখানা বন্ধ হয়ে ১ লাখ ১৯ হাজার ৮৪২ শ্রমিক কর্মহীন হওয়ার তথ্য একটি প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছিল। একইভাবে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিনটি শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ এবং ৬১ হাজার ৮৮১ শ্রমিকের সরাসরি কর্মসংস্থান হারানোর তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে এসব পরিসংখ্যানের উৎস, আওতা ও সময়সীমা ভিন্ন হওয়ায় তুলনামূলক বিশ্লেষণের আগে সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।

কারখানা বন্ধ হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ব্যাংকঋণের চাপ, বাজারে চাহিদার ঘাটতি, জ্বালানির অনিশ্চয়তা ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিরাপত্তাহীনতা ও ব্যবসায়িক আস্থার সংকটও পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।

তাই শিল্পকারখানা বন্ধের প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে খাতভিত্তিক সমাধান গ্রহণ করতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠান সাময়িক আর্থিক সংকটে রয়েছে, তাদের পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। তবে অকার্যকর প্রতিষ্ঠানকে যথাযথ মূল্যায়ন ছাড়া আর্থিক সুবিধা দিয়ে যাওয়াও সমাধান নয়।

### জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপ

শিল্পোৎপাদনের অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ। বিশেষ করে টেক্সটাইল, নিটওয়্যার, ডাইং, সিরামিক, কাচ, কাগজ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ইস্পাতশিল্পে গ্যাস-বিদ্যুতের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জ্বালানির ঘাটতি হলে উৎপাদন ব্যাহত হয়, পণ্যের খরচ বাড়ে এবং নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। রপ্তানিমুখী শিল্পে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর প্রভাব পড়ে নতুন রপ্তানি আদেশ, বিনিয়োগ এবং শ্রমিকের কর্মসংস্থানের ওপর।

উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও প্রতিযোগিতামূলক বাজারে সব প্রতিষ্ঠান পণ্যের দাম বাড়াতে পারে না। দীর্ঘদিন ব্যয়বৃদ্ধির চাপ চলতে থাকলে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগ স্থগিত করতে পারেন, কর্মঘণ্টা কমাতে পারেন কিংবা কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানির নির্ভরযোগ্য সরবরাহ, বিদ্যুৎ ও গ্যাস ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরি। শিল্পের উৎপাদনক্ষমতা রক্ষা করা গেলে বিদ্যমান কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাও বাড়বে।

### উচ্চশিক্ষিত তরুণদের হতাশা: শিক্ষার সঙ্গে কাজের দূরত্ব

বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের অন্যতম বড় সম্পদ। তাদের দক্ষতা ও সৃজনশীলতাকে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করা গেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উদ্ভাবন ও সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব। কিন্তু উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাবে শিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন অপেক্ষায় থাকলে জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানোর সুযোগ সংকুচিত হবে।

অনেক তরুণ বছরের পর বছর সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আবেদন করছেন কিংবা বিদেশে কর্মসংস্থানের চেষ্টা করছেন। তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজের সুযোগ সব সময় তৈরি হচ্ছে না। এতে ব্যক্তিগত হতাশার পাশাপাশি পরিবারগুলোর ওপরও আর্থিক চাপ বাড়ছে।

এ সমস্যার জন্য শুধু শিক্ষাব্যবস্থাকে দায়ী করাও যথেষ্ট নয়। বাস্তবমুখী দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও কাজের অভিজ্ঞতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি এসব দক্ষতা কাজে লাগানোর মতো পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানও তৈরি করতে হবে। শিক্ষিত তরুণদের চাকরি না পাওয়ার দায় তাঁদের ব্যক্তিগত অযোগ্যতার ওপর চাপিয়ে দিলে সংকটের কাঠামোগত কারণগুলো আড়ালে থেকে যাবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পোদ্যোক্তা ও সরকারের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে শ্রমবাজারের চাহিদাভিত্তিক কারিগরি প্রশিক্ষণ, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি এবং কর্মমুখী শিক্ষা সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর সেবা, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও নতুন শিল্পে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়াতে হবে।

### কর্মসংস্থান সংকট ও অপরাধ: সম্পর্ক আছে, সরল সমীকরণ নয়

দীর্ঘদিন আয়হীন থাকা, ঋণের বোঝা, পারিবারিক ব্যয় মেটাতে না পারা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ সৃষ্টি করে। সামাজিক সুরক্ষা দুর্বল হলে এবং বৈধ উপায়ে আয়ের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়লে কিছু মানুষের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের প্রবণতা বাড়তে পারে।

তবে বেকারত্ব বাড়লেই অপরাধ বাড়বে, কিংবা প্রতিটি অপরাধের পেছনে অর্থনৈতিক সংকটই দায়ী—এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য নয়। হত্যাকাণ্ড, অপহরণ, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও সংঘবদ্ধ অপরাধের পেছনে বিভিন্ন উদ্দেশ্য, পরিস্থিতি ও সাংগঠনিক কারণ কাজ করে। এসব অপরাধের সঙ্গে কর্মসংস্থানের সম্পর্ক নির্ধারণে দীর্ঘমেয়াদি তথ্য, অপরাধের ধরন এবং নির্ভরযোগ্য গবেষণা প্রয়োজন।

তবু কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো, তরুণদের উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করা এবং ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে সহায়তা দেওয়া সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। অপরাধ দমনে কার্যকর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাগুলোর প্রতিও নজর দিতে হবে।

### নিরাপত্তাহীনতা ও বিনিয়োগের সংকট

কর্মসংস্থান ও আইনশৃঙ্খলার সম্পর্ক একমুখী নয়। অর্থনৈতিক সংকট সামাজিক ঝুঁকি বাড়াতে পারে; আবার চাঁদাবাজি, অবৈধ দখল, সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতা বিনিয়োগের পরিবেশ দুর্বল করতে পারে।

একজন উদ্যোক্তা নতুন কারখানা স্থাপনের আগে জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহনব্যবস্থা, ঋণপ্রাপ্তি, বাজারের চাহিদা এবং ব্যবসার নিরাপত্তা বিবেচনা করেন। এসব ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা বেশি থাকলে বিনিয়োগ পিছিয়ে যেতে পারে কিংবা অন্যত্র চলে যেতে পারে। এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতিও কমে যায়।

এভাবে একটি নেতিবাচক চক্র তৈরি হয়—কর্মসংস্থান কমলে মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হয়; চাহিদা কমলে ব্যবসা ও উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়; অনিশ্চয়তায় বিনিয়োগকারীরা সতর্ক হন; আর বিনিয়োগ কমে গেলে নতুন কাজের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে।

এই চক্র ভাঙতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, ব্যবসায়িক বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তি, চাঁদাবাজি ও অবৈধ দখল প্রতিরোধ, চুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর পাশাপাশি শ্রমিকের অধিকার ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

### সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা

কর্মসংস্থান সংকটের সমাধান কোনো একক পদক্ষেপে সম্ভব নয়। এর জন্য স্বল্পমেয়াদি সহায়তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংস্কার প্রয়োজন।

প্রথমত, শিল্পকারখানা পুনরুদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। বন্ধ ও সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক অবস্থা মূল্যায়ন করে যেগুলো পুনরায় চালু করা সম্ভব, সেগুলোর জন্য স্বচ্ছ শর্তে ঋণ পুনর্গঠন ও পুনর্বাসন অর্থায়নের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, জ্বালানি সরবরাহ ও উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিল্প অবকাঠামোর উন্নয়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ করতে হবে। শুধু বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর না করে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, স্থানীয় উৎপাদন, তথ্যপ্রযুক্তি, পর্যটন এবং শ্রমঘন সেবাখাতে নতুন উদ্যোগ উৎসাহিত করা দরকার।

চতুর্থত, কর্মহীন শ্রমিক ও শিক্ষিত বেকারদের সহায়তা দিতে হবে। প্রশিক্ষণ, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি, চাকরির তথ্যপ্রাপ্তি, শ্রম অধিকার রক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সাময়িক সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।

পঞ্চমত, শ্রমবাজারের নির্ভরযোগ্য তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। বেকারের সংখ্যা ছাড়াও কত মানুষ কাজ হারাচ্ছেন, কতজন অপ্রতুল কর্মসংস্থানে রয়েছেন, কোন খাতে মজুরি কমছে এবং কত নতুন চাকরি সৃষ্টি হচ্ছে—এসব তথ্য নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।

এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বয়, নীতির ধারাবাহিকতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শুধু পরিকল্পনা ঘোষণা নয়, বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে।

### প্রবৃদ্ধির চেয়ে বড় প্রশ্ন: মানুষের কাজ কোথায়?

বাংলাদেশের সামনে এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুফল কতটা মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে এবং অর্থনীতি কতটা মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারছে। প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন প্রয়োজন; কিন্তু এগুলোর সঙ্গে মানুষের কাজ ও আয় বৃদ্ধির কার্যকর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত না হলে উন্নয়নের সুফল অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

২৬ লাখের বেশি বেকারের পরিসংখ্যানের প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একজন মানুষ, একটি পরিবার এবং একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। কারও হাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ আছে, কিন্তু চাকরি নেই। কেউ দীর্ঘদিন কাজ করার পর কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মহীন হয়েছেন। আবার কেউ কাজ করেও তাঁর আয় দিয়ে সংসারের ন্যূনতম ব্যয় মেটাতে পারছেন না। এসব বাস্তবতা অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্রেরই অংশ।

কর্মসংস্থানকে তাই শুধু শ্রম কিংবা শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে শিক্ষা, জ্বালানি, ব্যাংকিং, বিনিয়োগ, বাণিজ্য, সামাজিক নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। সব ক্ষেত্রের নীতিকে সমন্বিত করে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করতে হবে।

একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা, ব্যবসায়িক নিরাপত্তা এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা জরুরি। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, অধিকার ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ রক্ষা করতে হবে। শ্রমঘন শিল্পের সমস্যাগুলো সমাধান না করে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রত্যাশা যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি শ্রমিকের নিরাপত্তা উপেক্ষা করে শিল্পায়নের সুফলও টেকসই হতে পারে না।

সবশেষে মনে রাখতে হবে, একটি কারখানার দরজা বন্ধ হলে শুধু উৎপাদন বন্ধ হয় না; একটি পরিবারের আয় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, সন্তানের শিক্ষার ব্যয় সংকুচিত হয় এবং স্থানীয় অর্থনীতির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। কর্মসংস্থানের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব অর্থনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে সামাজিক স্থিতিশীলতা ও জননিরাপত্তাকেও স্পর্শ করতে পারে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টি শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নয়; এটি দারিদ্র্য হ্রাস, সামাজিক শান্তি, জননিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা রক্ষারও অন্যতম শর্ত। এখন প্রয়োজন উদ্বেগজনক পরিসংখ্যানকে কার্যকর নীতিতে রূপান্তর করা, শিল্প ও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং তরুণদের জন্য বাস্তব কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। মানুষ যেন শুধু কাজের প্রত্যাশায় দিন না কাটায়, বরং কাজের মাধ্যমে নিজের ও পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে—এটাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রীয় উন্নয়ননীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।






মতামত দিন।

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*