পাহাড়ে অশান্তির রাজনীতি: শান্তির পথে বাধা কোথায়?- মোহাম্মদ হাসান
সবুজ পাহাড়, মেঘের ভেলা, ঝরনা আর বৈচিত্র্যময় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি—প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনন্য আধার বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান শুধু পর্যটনের সম্ভাবনাময় অঞ্চল নয়, ভৌগোলিক অবস্থান, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং সীমান্তগত গুরুত্বের কারণেও বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার অত্যন্ত সংবেদনশীল অংশ। অথচ এই সৌন্দর্যের আড়ালে কয়েক দশক ধরে জমে আছে অবিশ্বাস, ভূমিবিরোধ, রাজনৈতিক বিভাজন, সশস্ত্র সংঘাত ও নানা স্বার্থের দ্বন্দ্ব। কখনো পাহাড়ি-বাঙালি বিরোধ, কখনো পাহাড়ি সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ, কখনো রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা—বিভিন্ন উপলক্ষে বারবার অশান্ত হয়ে উঠছে পাহাড়।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আবারও সেই পুরোনো প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে: পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা কেন এত কঠিন? কারা এই অস্থিতিশীলতা থেকে লাভবান হচ্ছে? রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্তের নিরাপত্তা রক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের অধিকার ও মর্যাদা কীভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব?
৩১ অক্টোবর রাঙামাটির বাঘাইছড়ির সাজেকের কলাবুনিয়া এলাকায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) সশস্ত্র সদস্যদের মধ্যে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে গোলাগুলির খবর প্রকাশিত হয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বিরোধ থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত। দুর্গম এলাকা হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের তথ্য পাওয়া যায়নি। এর আগে সাজেকে অবরোধ, পর্যটকদের আটকে পড়া, স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে অবরোধকারীদের উত্তেজনার ঘটনাও ঘটেছে।
এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, পাহাড়ে সংঘাতের পুনরাবৃত্তি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাগত সংকটের বহিঃপ্রকাশ। তবে কোনো ঘটনার দায় নির্ধারণের আগে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। কোনো পক্ষের অভিযোগ কিংবা প্রাথমিক বক্তব্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ করা দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়।
ইতিহাসের অসমাপ্ত অধ্যায়
পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান সংকটের শিকড় বুঝতে হলে স্বাধীনতার পরবর্তী ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে। ১৯৭২ সালের সংবিধানে জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নে পাহাড়ের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। তাদের একটি অংশ নিজেদের স্বতন্ত্র জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের স্বীকৃতি, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং ভূমির অধিকার দাবি করে। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে ১৯৭২ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) গঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে সংগঠনটির সামরিক শাখা হিসেবে শান্তিবাহিনীর আত্মপ্রকাশ ঘটে।
স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের জাতীয়তাবাদী ধারণা, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং পাহাড়ের জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র পরিচয়ের প্রশ্নে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তা রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব হয়নি। একপর্যায়ে সশস্ত্র সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়।
আশির দশকে পার্বত্য অঞ্চলে সমতল থেকে বাঙালি পরিবার পুনর্বাসনের সরকারি উদ্যোগ জনসংখ্যার বিন্যাসে বড় পরিবর্তন আনে। এর সঙ্গে ভূমির মালিকানা, বসতি স্থাপন, জীবিকা এবং ঐতিহ্যগত ভূমি ব্যবহারের প্রশ্ন জড়িয়ে যায়। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর একটি অংশ নিজেদের প্রথাগত ভূমির অধিকার সংকুচিত হওয়ার অভিযোগ তোলে। অন্যদিকে পুনর্বাসিত বাঙালি পরিবারগুলোরও বসবাস, জীবিকা, নিরাপত্তা এবং বৈধ সম্পত্তির অধিকার রয়েছে। ফলে ভূমি প্রশ্নটি কেবল একটি জনগোষ্ঠীর দাবি নয়; এটি বহু পক্ষের অধিকার, ইতিহাস ও আইনি জটিলতার বিষয়।
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। দীর্ঘ সশস্ত্র সংঘাতের অবসান এবং রাজনৈতিক সমাধানের পথে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। চুক্তির ফলে শান্তিবাহিনীর সদস্যদের একটি অংশ অস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ পান। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরই যে শান্তি প্রতিষ্ঠার শেষ কথা নয়, পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ তা স্পষ্ট করেছে।
চুক্তির বিভিন্ন ধারা বাস্তবায়ন, আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদের কার্যকর ক্ষমতা, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি, স্থানীয় প্রশাসনে কর্তৃত্ব এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রশ্ন এখনো বিতর্কের কেন্দ্রে। চুক্তি বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা একদিকে পাহাড়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে, অন্যদিকে চুক্তির বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর উত্থানের ক্ষেত্রও তৈরি করেছে।
সশস্ত্র সংগঠনের আধিপত্যের লড়াই
পাহাড়ের অশান্তির অন্যতম বড় কারণ বিভিন্ন আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনের মধ্যকার বিরোধ। পিসিজেএসএসের বিভাজন, ইউপিডিএফের উত্থান, পরবর্তী সময়ে ইউপিডিএফের ভাঙন এবং জেএসএসের বিভিন্ন অংশের মধ্যে বিরোধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এর পাশাপাশি কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা পার্বত্য অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে।
এসব সংগঠনের রাজনৈতিক দাবি, সাংগঠনিক অবস্থান ও পারস্পরিক বিরোধ এক নয়। কিন্তু কোনো সংগঠনই যদি অস্ত্রের মাধ্যমে এলাকার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, প্রতিপক্ষকে বিতাড়ন, চাঁদাবাজি কিংবা সাধারণ মানুষের ওপর ভয়ভীতি প্রয়োগের চেষ্টা করে, তাহলে তা রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের স্বাভাবিক পদ্ধতি হতে পারে না।
সাজেকের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে এই বাস্তবতা আবারও সামনে এসেছে। কোনো একটি সংগঠনের সশস্ত্র সদস্যদের এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে আন্দোলন হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—দাবিদার পক্ষের অবস্থান কী, তাদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পর্ক কেমন এবং তারা নিজেরা অস্ত্র ও আধিপত্যের রাজনীতি থেকে কতটা দূরে? একই প্রশ্ন প্রতিপক্ষ সংগঠনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
এক পক্ষের সশস্ত্র তৎপরতার প্রতিবাদ করতে গিয়ে অন্য পক্ষের সশস্ত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করা যায় না। পাহাড়ের সাধারণ মানুষকে কোনো সংগঠনের শক্তি প্রদর্শনের উপকরণ কিংবা রাজনৈতিক কর্মসূচির মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করার অধিকার কারও নেই।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, এই সংঘাতের প্রধান ভুক্তভোগী সাধারণ পাহাড়ি ও বাঙালি মানুষ। কৃষক, জুমচাষি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহনশ্রমিক, পর্যটননির্ভর উদ্যোক্তা এবং শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন। অপহরণ, চাঁদাবাজি, জোরপূর্বক অর্থ আদায়, ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত করা কিংবা ভয় দেখিয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে বাধ্য করার অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। কোনো জনগোষ্ঠীকে সামগ্রিকভাবে দায়ী না করে অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে আইনের আওতায় আনাই ন্যায়সংগত পথ।
ভূমি সমস্যা: সংকটের সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গা
পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে ভূমি। পাহাড়ের জনগোষ্ঠীর কাছে ভূমি শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; এটি তাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, পরিচয়, সামাজিক কাঠামো এবং জীবনযাত্রার সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী বাঙালি পরিবারগুলোর কাছেও জমি ও বসতভিটা জীবন-জীবিকার মৌলিক ভিত্তি।
এই বাস্তবতায় এক পক্ষের অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে অন্য পক্ষের বৈধ অধিকার অস্বীকার করলে সংকটের সমাধান হবে না। আবার প্রথাগত ভূমির অধিকার উপেক্ষা করে কেবল প্রচলিত দলিলের ভিত্তিতে সব বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করলেও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কঠিন।
পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠন করা হলেও কার্যকর নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। কমিশনের কার্যক্রম, প্রয়োজনীয় বিধিমালা, বিরোধ নিষ্পত্তির পদ্ধতি এবং স্থানীয় জনগণের আস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। আধুনিক ভূমি জরিপ, ঐতিহাসিক নথি, প্রথাগত ভূমি ব্যবহারের প্রমাণ এবং বৈধ মালিকানার দলিল সমন্বিতভাবে বিবেচনায় নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি করতে হবে।
কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক গোষ্ঠী কিংবা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পর্যটন, রিসোর্ট বা উন্নয়ন প্রকল্পের নামে অবৈধভাবে জমি দখল করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বৈধ মালিকানার জমিতে বসবাসকারী কোনো পরিবারকে জাতিগত পরিচয়ের কারণে উচ্ছেদ বা হয়রানি করা যাবে না। ভূমি প্রশ্নে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ছাড়া পাহাড়ের স্থায়ী শান্তির কথা বলা বাস্তবসম্মত নয়।
ভূরাজনীতি: আশঙ্কা ও বাস্তবতার পার্থক্য
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূগোল একে বাংলাদেশের অন্যতম কৌশলগত অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরাম এবং মিয়ানমারের চিন ও রাখাইন অঞ্চলের সঙ্গে এর সীমান্তসংযোগ রয়েছে। মিয়ানমারের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, সীমান্তবর্তী সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা, শরণার্থী পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কৌশলগত প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য নিরাপত্তাগত উদ্বেগ তৈরি করে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের অতীত সংঘাতে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ, গবেষণা ও বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছে। শান্তিবাহিনীর সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিক যোগাযোগ ও সহায়তার অভিযোগও আলোচনায় এসেছে। সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় এসব বিষয় নতুন করে পর্যালোচনা করা হয়েছে। তবে কোনো গবেষণায় উত্থাপিত যুক্তি বা ঐতিহাসিক অভিযোগকে বর্তমান সময়ে বিদেশি রাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।
এখানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব আবেগনির্ভর প্রচারণা নয়, তথ্যনির্ভর নিরাপত্তা মূল্যায়ন। কোনো বিদেশি শক্তি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সংঘাতকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে কি না, কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী সীমান্তের ওপার থেকে অস্ত্র, অর্থ কিংবা প্রশিক্ষণ পাচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ গোয়েন্দা অনুসন্ধান প্রয়োজন। প্রমাণ পাওয়া গেলে কূটনৈতিক ও আইনগতভাবে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, পাহাড়ের মানুষের সাংস্কৃতিক পরিচয়, আত্মীয়তার সম্পর্ক কিংবা সীমান্তের ওপারের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ঐতিহাসিক যোগাযোগকে বিদেশি ষড়যন্ত্রের প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কোনো জনগোষ্ঠীর ন্যায্য অধিকার ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে নিরাপত্তার অজুহাতে সন্দেহের চোখে দেখলে রাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের দূরত্ব আরও বাড়বে। সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা পরস্পরবিরোধী নয়; বরং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এ দুটি দায়িত্ব একে অন্যের পরিপূরক।
সংঘাতের অর্থনীতি: শান্তির পথে অদৃশ্য বাধা
পাহাড়ে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সংঘাতকেন্দ্রিক অর্থনীতি। বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্র, মাদক চোরাচালান, কাঠ পাচার এবং স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ রয়েছে। এসব অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ব্যক্তি, সশস্ত্র গোষ্ঠী কিংবা প্রভাবশালী স্বার্থান্বেষী মহলের সম্পৃক্ততা থাকলে তা অনুসন্ধান করা জরুরি।
সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে কিছু গোষ্ঠী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা পায়। অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, পরিবহন ও পণ্য সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ কিংবা পর্যটন ব্যবসায় প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়। শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলে এই অবৈধ সুবিধার ক্ষেত্র সংকুচিত হবে। ফলে সংঘাত থেকে লাভবান গোষ্ঠী শান্তির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তবে এই অর্থনীতির অস্তিত্বকে কোনো একটি জনগোষ্ঠী বা সংগঠনের ওপর সামগ্রিকভাবে চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। অর্থের উৎস, সুবিধাভোগী, চাঁদা আদায়ের নেটওয়ার্ক এবং অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে হবে। অর্থনৈতিক অপরাধের বিরুদ্ধে অভিযান হতে হবে নির্দিষ্ট তথ্য ও আইনের ভিত্তিতে।
নিরাপত্তা বনাম অধিকার: রাষ্ট্রের ভারসাম্য কোথায়?
পাহাড়ে সেনাবাহিনী ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। একদিকে সশস্ত্র তৎপরতা, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং দুর্গম এলাকায় রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব বজায় রাখতে নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে কোনো অভিযান, তল্লাশি কিংবা গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে নাগরিক অধিকার, আইনের শাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে স্থানীয় মানুষের মধ্যে ভীতি ও অনাস্থা তৈরি হতে পারে।
তাই নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে কেবল বাহিনীর সংখ্যা বৃদ্ধি বা অভিযাননির্ভর করে দেখলে চলবে না। প্রয়োজন পেশাদার পুলিশিং, গোয়েন্দা সক্ষমতা, স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা এবং মানবাধিকারসম্মত আইন প্রয়োগ। পাহাড়ের অপরাধ দমনে পুলিশকে আরও দক্ষ ও সক্ষম করতে হবে। স্থানীয় ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক বাস্তবতা সম্পর্কে প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা নিয়োগ এবং পাহাড়ি-বাঙালি তরুণদের যোগ্যতা ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে।
কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে হয়রানি করা কিংবা একটি সম্প্রদায়ের সবাইকে সন্দেহভাজন হিসেবে বিবেচনা করা নিরাপত্তার জন্যও ক্ষতিকর। বরং স্থানীয় মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারলে অপরাধ, অস্ত্রের অবস্থান, চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র তৎপরতার বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া সহজ হবে।
শান্তির জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা
পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকট সমাধানে প্রথম কাজ হওয়া উচিত ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন অগ্রগতি নিয়ে একটি স্বচ্ছ ও সময়বদ্ধ পর্যালোচনা। কোন ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে, কোনটি হয়নি এবং কেন হয়নি—তা জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদকে কার্যকর করা, স্থানীয় প্রশাসনে যথাযথ ক্ষমতা ও দায়িত্ব হস্তান্তর এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জবাবদিহিমূলক শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
পাশাপাশি শান্তিচুক্তির বাইরে থাকা কিংবা চুক্তির সঙ্গে দ্বিমত পোষণকারী রাজনৈতিক পক্ষগুলোকেও আলোচনার আওতায় আনতে হবে। সংলাপের অর্থ কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর অন্যায় দাবি মেনে নেওয়া নয়; বরং অস্ত্রের পরিবর্তে রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় মত প্রকাশের পথ তৈরি করা। অস্ত্র পরিহার, পুনর্বাসন এবং স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তনের জন্য বিশ্বাসযোগ্য কর্মসূচি প্রয়োজন।
পাহাড়ি ও বাঙালি—উভয় জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে নিয়মিত আন্তঃসম্প্রদায় সংলাপ, স্থানীয় শান্তি কমিটি এবং কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম শক্তিশালী করা দরকার। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর অভ্যন্তরেও যেন কোনো একটি জনগোষ্ঠী বা নেতৃত্ব অন্যদের প্রতিনিধিত্বের একচেটিয়া অধিকার দাবি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, খিয়াং, বমসহ সব জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, ভূমি ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অধিকার সমান গুরুত্ব পেতে হবে।
এ ছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। পর্যটন উন্নয়ন করতে হবে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ও পরিবেশ সংরক্ষণের ভিত্তিতে। পর্যটন থেকে অর্জিত অর্থের ন্যায্য অংশ স্থানীয় মানুষের হাতে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। পাহাড়ের তরুণদের জন্য কারিগরি শিক্ষা, উদ্যোক্তা সহায়তা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব কিংবা অপরাধনির্ভর অর্থনীতির বিকল্প তৈরি হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, সাম্প্রদায়িক উসকানি ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে সংঘাত উসকে দেওয়ার প্রবণতা প্রতিরোধ করতে হবে। তবে এই প্রতিরোধের নামে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করা যাবে না। তথ্য যাচাই, দ্রুত সরকারি বক্তব্য, স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে গুজব মোকাবিলা করতে হবে।
পাহাড় কারও একার নয়, শান্তিও কারও একার দায়িত্ব নয়
পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকট সমাধানে সবচেয়ে বড় ভুল হবে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে এককভাবে দায়ী করা কিংবা বাঙালি জনগোষ্ঠীর ন্যায্য অধিকারকে অস্বীকার করা। পাহাড়ের সাধারণ মানুষ, তাদের জাতিগত পরিচয় যা-ই হোক, বিপুল অংশই নিরাপদ জীবন, সম্মানজনক জীবিকা, শিক্ষা, উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা চান। তাদের কণ্ঠস্বরই হওয়া উচিত রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
একইভাবে সশস্ত্র গোষ্ঠীর অপরাধকে রাজনৈতিক অধিকারের আড়ালে বৈধতা দেওয়া যাবে না। আবার নিরাপত্তার নামে কোনো জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক ও মানবিক অধিকার সংকুচিত করাও গ্রহণযোগ্য নয়। রাষ্ট্রের শক্তি কেবল অস্ত্রের সক্ষমতায় নয়, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, নাগরিকের আস্থা অর্জন এবং বৈষম্যহীন প্রশাসন নিশ্চিত করার মধ্যেও নিহিত।
পার্বত্য চট্টগ্রাম অশান্ত থাকলে লাভবান হতে পারে অস্ত্রনির্ভর আধিপত্যবাদী গোষ্ঠী, চাঁদাবাজির সঙ্গে যুক্ত অপরাধী চক্র এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা থেকে সুবিধা নিতে আগ্রহী স্বার্থান্বেষী পক্ষ। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাংলাদেশ, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পাহাড়ের সাধারণ মানুষ, বাধাগ্রস্ত হয় জাতীয় উন্নয়ন ও সার্বভৌমত্বের নিরাপত্তা।
তাই প্রশ্নটি শুধু পাহাড়ে কে কার বিরুদ্ধে লড়ছে, তা নয়; বরং কেন রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের উদ্যোগ সত্ত্বেও একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। কেন ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি হচ্ছে না, কেন সাধারণ মানুষ অস্ত্রের ভয় থেকে মুক্তি পাচ্ছে না, কেন শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে এত দীর্ঘসূত্রতা এবং কেন স্থানীয় মানুষের আস্থা অর্জনে রাষ্ট্র বারবার পিছিয়ে পড়ছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন দৃঢ় রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, শান্তিচুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন, ভূমি সমস্যার ন্যায়সংগত সমাধান এবং সব জনগোষ্ঠীর মর্যাদাপূর্ণ সহাবস্থান। একই সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা ও বিদেশি হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা মোকাবিলায় সতর্ক, পেশাদার ও তথ্যনির্ভর রাষ্ট্রনীতি অপরিহার্য।
পাহাড়কে শান্ত করতে হলে পাহাড়ের মানুষকে জয় করতে হবে—ভয় দেখিয়ে নয়, আস্থা দিয়ে; বৈষম্য সৃষ্টি করে নয়, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে; অস্ত্রের প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে নয়, রাজনৈতিক সমাধানের পথ প্রশস্ত করে। কারণ, পাহাড়ের শান্তি কোনো একটি রাজনৈতিক দলের সাফল্য কিংবা কোনো একটি জনগোষ্ঠীর বিজয় নয়। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, গণতান্ত্রিক পরিপক্বতা এবং জাতীয় ঐক্যের পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, আর সেই শান্তির সবচেয়ে বড় অধিকারী পাহাড়ের সাধারণ মানুষ।
সংশ্লিষ্ট সংবাদ
আওয়ামী লীগে আবারও ‘আমিলীগ’-এর ছায়া: দুঃসময়ের ত্যাগীরা কি ফের উপেক্ষিত হবেন?
–মোহাম্মদ হাসান বাংলাদেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর অন্যতম আওয়ামী লীগ। ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ভাষাআরো পড়ুন
