প্রাণের ৭১

ডেঙ্গু-হামের থাবা: মৃত্যুর মিছিল থামাতে ব্যর্থতা কার?- মোহাম্মদ হাসান

বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। ডেঙ্গু ও হামের সংক্রমণ যেন একসঙ্গে চেপে বসেছে মানুষের জীবনে। প্রতিদিন হাসপাতালের বিছানায় বাড়ছে রোগীর সংখ্যা, দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর তালিকা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হিসাব আসছে ঠিকই, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই পরিসংখ্যান কমানোর কার্যকর উদ্যোগ কোথায়? মানুষের জীবন রক্ষায় রাষ্ট্রের প্রস্তুতি কতটা?

২৪ অক্টোবর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৮৯৮ জন। চলতি বছরের ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ২১ হাজার ৬৯৯ জন। প্রাণ হারিয়েছেন ৩৭৬ জন। সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ লাখ ১৫ হাজার ১৩২ জন।

এ পরিসংখ্যান কেবল কিছু সংখ্যা নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, স্বজন হারানোর বেদনা এবং একটি অসমাপ্ত জীবনের গল্প। অথচ প্রতিদিন মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হতে হতে ভয়াবহ বাস্তবতাও যেন আমাদের কাছে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। এটি আরও বিপজ্জনক। কারণ, মৃত্যুর সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়া কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না।

নিয়ন্ত্রণের আশ্বাস, বাস্তবতায় বাড়ছে উদ্বেগ

ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে নানা আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বৃষ্টিপাতের কারণে এ বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে। বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান, চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ এবং সমন্বিত উদ্যোগের কথাও জানানো হচ্ছে। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছে, আগাম পরিকল্পনা ও চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের কারণে মৃত্যুহার আগের তুলনায় কমেছে।

সরকারের এসব উদ্যোগকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু উদ্যোগের মূল্যায়ন করতে হবে বাস্তব ফলাফলের ভিত্তিতে। গত বছরের ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৬৩ হাজার ১৭০। চলতি বছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৯ হাজার ৮০১-এ। অর্থাৎ আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। একই সময়ে মৃত্যুর সংখ্যাও ২৫৯ থেকে বেড়ে ৩৭১-এ পৌঁছেছে। ২৪ অক্টোবরের সর্বশেষ হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেড়ে ৩৭৬।

এ অবস্থায় শুধু মৃত্যুহার কমার দাবি দিয়ে সামগ্রিক পরিস্থিতিকে স্বস্তিদায়ক বলা যায় না। মৃত্যুহার, মোট আক্রান্ত এবং মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই পরিস্থিতির মূল্যায়ন করতে হবে। মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রোগে আক্রান্ত হয়ে কতজন প্রাণ হারাচ্ছেন এবং সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার কতটা সফল হচ্ছে।

হামের প্রাদুর্ভাব: শিশুদের নিরাপত্তা কোথায়?

ডেঙ্গুর পাশাপাশি হামের প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ২১৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ২ লাখ ১৮ হাজার ৮৭০ জনের মধ্যে এবং পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়েছে ২৩ হাজার ২৭৩ জনের।

শিশুদের জন্য হাম কোনো সাধারণ অসুস্থতা নয়। সময়মতো টিকা, যথাযথ চিকিৎসা ও পুষ্টি নিশ্চিত করা গেলে এ রোগে গুরুতর জটিলতা ও মৃত্যু অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাহলে এত শিশুর মৃত্যু কেন? টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি কোথায়? প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুদের কাছে টিকা পৌঁছাচ্ছে কি? ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। কারণ, টিকাদান কর্মসূচি শুধু একটি স্বাস্থ্য বিভাগের নিয়মিত কার্যক্রম নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখার রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।

সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন পদ্ধতিগত পরিবর্তন

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের বক্তব্যে সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। তাঁর মতে, ডেঙ্গু ও হাম এখন জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতি। গতানুগতিক চিকিৎসাব্যবস্থা দিয়ে এ ধরনের সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত জনবল, দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কার্যক্রম পরিচালনা।

বিশেষ করে হামের টিকাদানে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে আওতায় আনার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য প্রয়োজন এলাকাভিত্তিক মাইক্রোপ্ল্যানিং, বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুর তালিকা তৈরি, বাদ পড়া শিশুদের শনাক্তকরণ এবং টিকাদান কার্যক্রমের নিবিড় তদারকি। শুধু টিকাদান কর্মসূচি চলছে—এমন ঘোষণা যথেষ্ট নয়; কতজন শিশু টিকা পেল, কতজন বাদ পড়ল এবং বাদ পড়ার কারণ কী, তার নির্ভরযোগ্য হিসাব থাকতে হবে।

একইভাবে ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু মশা নিধনের প্রচার কিংবা পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত নজরদারি, এলাকাভিত্তিক সংক্রমণ শনাক্তকরণ এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য বিভাগ ও নাগরিকদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে।

প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জবাবদিহি

ডেঙ্গু ও হাম মোকাবিলায় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় সমন্বয় ও জবাবদিহি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আন্তমন্ত্রণালয় টাস্কফোর্স গঠন করে প্রতিদিন পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা যেতে পারে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।

হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ সামলাতে স্তরভিত্তিক চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। সব রোগীকে বড় হাসপাতালে পাঠানোর পরিবর্তে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষার ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। যাঁদের নিবিড় পরিচর্যা প্রয়োজন, তাঁদের জন্য আইসিইউ ও দক্ষ জনবল নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দরিদ্র পরিবারের রোগীদের চিকিৎসার ব্যয় বহনে রাষ্ট্রকে কার্যকর সহায়তা দিতে হবে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোর দায়িত্বও কম নয়। বছরের নির্দিষ্ট মৌসুমে তৎপরতা দেখিয়ে বাকি সময় নিষ্ক্রিয় থাকলে চলবে না। মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণে সারা বছর নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। যেসব এলাকায় সংক্রমণ বেশি, সেখানে বিশেষ নজরদারি ও দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।

আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—ডেঙ্গুর টিকা নিয়ে কোনো ধরনের অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত নয়। নিরাপত্তা, কার্যকারিতা এবং আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

প্রতিটি মৃত্যুর দায় এড়ানোর সুযোগ নেই

ডেঙ্গু ও হাম প্রাকৃতিকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে, কিন্তু প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুকে নিয়তি বলে মেনে নেওয়ার সুযোগ নেই। সংক্রমণ সম্পূর্ণ নির্মূল করা কঠিন হতে পারে, কিন্তু পরিকল্পিত উদ্যোগ, সময়মতো শনাক্তকরণ, টিকাদান, জনসচেতনতা এবং মানসম্মত চিকিৎসার মাধ্যমে মৃত্যু অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

সরকারের কাছে তাই প্রত্যাশা শুধু আশ্বাস নয়, দৃশ্যমান ফলাফল। কোন এলাকায় কত মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন, কোথায় টিকাদানে ঘাটতি রয়েছে, কতটি হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা নেই—এসব তথ্য প্রকাশ করে নিয়মিত জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, জনস্বাস্থ্য কোনো রাজনৈতিক প্রচারণার বিষয় নয়; এটি নাগরিকের বেঁচে থাকার অধিকার। ডেঙ্গু ও হামের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ব্যর্থতার মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শিশুরা। প্রতিদিনের মৃত্যুসংবাদকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়ার আগে রাষ্ট্রকে নিজের দায়িত্বের মুখোমুখি হতে হবে।

প্রশ্ন একটাই—আর কত মৃত্যু হলে প্রতিরোধব্যবস্থা সত্যিকার অর্থে কার্যকর হবে? মানুষের জীবন রক্ষায় এখন আর আশ্বাস নয়, প্রয়োজন দৃশ্যমান পদক্ষেপ, সমন্বিত উদ্যোগ এবং কার্যকর জবাবদিহি।






মতামত দিন।

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*