আওয়ামী লীগে আবারও ‘আমিলীগ’-এর ছায়া: দুঃসময়ের ত্যাগীরা কি ফের উপেক্ষিত হবেন?
–মোহাম্মদ হাসান
বাংলাদেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর অন্যতম আওয়ামী লীগ। ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দলটি বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে নেতৃত্বদানকারী এই সংগঠনের রাজনৈতিক শক্তির মূল উৎস ছিল জনগণের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক, তৃণমূলের কর্মীদের আত্মত্যাগ এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও আদর্শের প্রতি অবিচল আনুগত্য।
কিন্তু একটি রাজনৈতিক দলের ঐতিহাসিক গৌরবই তার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে না। সংগঠনকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, ত্যাগী কর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন এবং নেতৃত্বের প্রতি জবাবদিহি। আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে যে প্রশ্নটি বারবার সামনে আসে, তা হলো—দলের দুঃসময়ে যারা পাশে থাকেন, সুসময়ে কি তারাই যথাযথ মর্যাদা পান? নাকি ক্ষমতা ও সুযোগের কাছাকাছি থাকা একটি সুবিধাবাদী গোষ্ঠী বারবার সংগঠনের ওপর প্রভাব বিস্তার করে?
বর্তমান বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক পুনর্গঠন ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথচলা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে, দলের ভেতরে কথিত ‘আমিলীগ’ সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা নতুন করে ভাবনার অবকাশ তৈরি করছে।
আওয়ামী লীগের শক্তির উৎস ছিল জনগণ, ক্ষমতার বলয় নয়
আওয়ামী লীগের জন্ম হয়েছিল তৎকালীন পূর্ববাংলার মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ও অর্থনৈতিক মুক্তির দাবিকে সামনে রেখে। প্রতিষ্ঠার পর দলটি ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্র বিস্তৃত করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং জনগণের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক আওয়ামী লীগকে একটি গণভিত্তিসম্পন্ন রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেছিল।
বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির মূল দর্শন ছিল জনগণকে সঙ্গে নিয়ে অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। তিনি ব্যক্তিগত সুবিধা কিংবা ক্ষমতার নিশ্চয়তাকে রাজনৈতিক জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেননি। বরং সংগঠনকে শক্তিশালী করার জন্য মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দলের কাজে আত্মনিয়োগ করেছেন, দীর্ঘ সময় কারাবরণ করেছেন এবং ব্যক্তিগত জীবনে অসংখ্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন।
১৯৬৬ সালের ছয় দফা কর্মসূচি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। এই কর্মসূচি বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের আকাঙ্ক্ষাকে সুসংগঠিত রাজনৈতিক দাবিতে রূপ দেয়। বঙ্গবন্ধু ছয় দফাকে জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ হয়ে উঠেছিল মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও অধিকার আদায়ের প্রধান রাজনৈতিক আশ্রয়।
এই ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট—আওয়ামী লীগের শক্তি কখনো শুধু নেতৃত্বের পদ-পদবি, প্রশাসনিক ক্ষমতা কিংবা অর্থনৈতিক প্রভাবের ওপর নির্ভরশীল ছিল না। এর প্রকৃত শক্তি ছিল সাধারণ মানুষের আস্থা এবং তৃণমূলের কর্মীদের নিঃস্বার্থ শ্রম।
দুঃসময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণরাই সংগঠনের প্রকৃত সম্পদ
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর আওয়ামী লীগকে কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। প্রতিকূলতা, বিভক্তি, দমন-পীড়ন এবং নানা সাংগঠনিক সংকটের মধ্যেও দলটি টিকে ছিল তার নিবেদিতপ্রাণ নেতা-কর্মীদের কারণে।
১৯৮১ সালে দেশে ফিরে শেখ হাসিনা দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন শেষে তিনি আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর নেতৃত্বে দলটি বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম, রাজনৈতিক সংকট ও নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে।
এই দীর্ঘ পথচলায় অসংখ্য নেতা-কর্মী মামলা, হামলা, কারাবরণ, আর্থিক সংকট ও ব্যক্তিগত ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছেন। অনেকে পরিবার-পরিজনের স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সংগঠনের কাজে সময় দিয়েছেন। কেউ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় ব্যয় করেছেন রাজপথে, কেউ সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেছেন নিভৃতে, আবার কেউ কোনো পদ-পদবি ছাড়াই দলের প্রতি ভালোবাসা থেকে কাজ করে গেছেন।
তাঁদের অনেকের নাম সংবাদপত্রে আসেনি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের প্রচারণা হয়নি, ক্ষমতার কেন্দ্রেও তাঁদের যাতায়াত ছিল না। কিন্তু সংগঠনের কঠিন সময়ে তাঁরাই ছিলেন দলের নির্ভরযোগ্য অবলম্বন।
অথচ রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রায়ই দেখা যায়, সুসময়ে সুযোগসন্ধানীদের ভিড় বাড়ে; আর দুঃসময়ে অনেক পরিচিত মুখ উধাও হয়ে যায়। ফলে দীর্ঘদিনের ত্যাগী কর্মীরা যখন দেখেন, অর্থবিত্ত, ব্যক্তিগত যোগাযোগ কিংবা নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার ভিত্তিতে কেউ কেউ সাংগঠনিক সুবিধা পাচ্ছেন, তখন তাঁদের মনে ক্ষোভ ও বঞ্চনার জন্ম নেওয়া অস্বাভাবিক নয়।
দলের জন্য নিবেদিত কর্মীদের এই অভিজ্ঞতা কোনো ব্যক্তিগত অভিমানমাত্র নয়; এটি সংগঠনের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও ন্যায়সংগত মূল্যায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
‘আমিলীগ’ সংস্কৃতি: আদর্শের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থ বড় হয়ে উঠলে
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পরিসরে একসময় ‘হাইব্রিড’, ‘কাউয়া’, ‘অনুপ্রবেশকারী’ ও ‘ফেসবুক লীগ’-এর মতো শব্দ আলোচনায় এসেছিল। এসব শব্দের ব্যবহার নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। তবে এর পেছনে যে সাংগঠনিক উদ্বেগটি প্রকাশ পেয়েছিল, তা হলো—দলের দীর্ঘদিনের কর্মীদের পাশ কাটিয়ে সুবিধাবাদী ও অনভিজ্ঞ একটি অংশ প্রভাবশালী হয়ে উঠছে কি না।
এখানেই কথিত ‘আমিলীগ’ সংস্কৃতির প্রসঙ্গটি গুরুত্বপূর্ণ। এই শব্দ দিয়ে এমন একটি প্রবণতাকে বোঝানো হয়, যেখানে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বার্থ দলীয় আদর্শের ওপর প্রাধান্য পায়; সাংগঠনিক আনুগত্যের পরিবর্তে ব্যক্তিগত আনুগত্য মুখ্য হয়ে ওঠে; আর ত্যাগ ও যোগ্যতার পরিবর্তে অর্থনৈতিক সামর্থ্য, যোগাযোগ এবং ক্ষমতাকেন্দ্রের নৈকট্য মূল্যায়নের প্রধান মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়।
একটি রাজনৈতিক দলে নতুন সদস্য যুক্ত হওয়া দোষের নয়। বরং সময়ের প্রয়োজনে নতুন নেতৃত্ব, নতুন চিন্তা ও নতুন কর্মীর অংশগ্রহণ সংগঠনকে গতিশীল করে। কিন্তু নতুনদের অন্তর্ভুক্তির নামে যদি পরীক্ষিত কর্মীদের অবমূল্যায়ন করা হয়, আদর্শের পরিবর্তে ব্যক্তিগত আনুগত্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত কয়েকজনের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে তা দলকে শক্তিশালী না করে দুর্বলই করে।
অর্থ ও প্রভাবের বিনিময়ে পদ-পদবি অর্জনের সুযোগ তৈরি হলে রাজনীতি জনসেবার ক্ষেত্র থেকে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের মাধ্যমে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। তখন সংগঠনের জন্য কাজ করা আর সংগঠনকে ব্যবহার করার মধ্যে পার্থক্য ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে যায়।
এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে দলের আদর্শিক ভিত্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কারণ সুবিধাবাদী রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক থাকে সুযোগের, আর আদর্শিক রাজনীতির সম্পর্ক থাকে দায়বদ্ধতার। সুযোগ শেষ হলে সুবিধাবাদীরা সরে যেতে পারেন; কিন্তু আদর্শে বিশ্বাসী কর্মীরা প্রতিকূলতার মধ্যেও সংগঠনের পাশে থাকার প্রেরণা খুঁজে পান।
৫ আগস্ট-পরবর্তী বাস্তবতা: আত্মগোপন, নীরবতা ও নতুন তৎপরতার প্রশ্ন
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা এক ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা, মামলা-মোকদ্দমা, গ্রেপ্তারের আশঙ্কা, সামাজিক চাপ এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে সক্রিয় থাকতে পারেননি। এ সময় কারও আত্মগোপনে থাকা কিংবা নীরব থাকার পেছনে বাস্তব নিরাপত্তাজনিত কারণও থাকতে পারে। তাই প্রত্যেকের পরিস্থিতিকে একই দৃষ্টিতে বিচার করা যুক্তিসংগত নয়।
তবে এই প্রতিকূল সময়ে কারা সংগঠনের কর্মীদের খোঁজখবর রেখেছেন, কারা বিপদে পড়া সহকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, কারা সাংগঠনিক যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন—সেসব প্রশ্নও উপেক্ষা করা যায় না।
রাজনৈতিক সংগঠনের প্রকৃত পরীক্ষা হয় দুঃসময়ে। সুসময়ে মঞ্চে বক্তব্য দেওয়া, বড় বড় ঘোষণা দেওয়া কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থাকা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু যখন সংগঠনের পক্ষে প্রকাশ্যে কথা বলা ঝুঁকিপূর্ণ, যখন সহকর্মীরা অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটান, তখন তাঁদের পাশে দাঁড়ানোই রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রকৃত পরিচয় দেয়।
এখন আবার বিভিন্ন টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে রাজনৈতিক বক্তব্য, সাংগঠনিক তৎপরতা এবং ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা দেখা যাচ্ছে বলে দলীয় পর্যায়ে অভিযোগ রয়েছে। ডিজিটাল যোগাযোগমাধ্যমে সাংগঠনিক যোগাযোগ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ ইতিবাচক হতে পারে। কিন্তু সেই উদ্যোগ যদি কেবল বক্তব্যের প্রতিযোগিতা, বড় বড় প্রতিশ্রুতি কিংবা ব্যক্তিগত বলয় সম্প্রসারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা সংগঠনের প্রকৃত পুনর্গঠনে কতটা ভূমিকা রাখবে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
যাঁরা দীর্ঘদিন নীরব ছিলেন, তাঁদের প্রত্যেকের উদ্দেশ্য নিয়ে ঢালাও মন্তব্য করা উচিত নয়। তবে তাঁদের নতুন তৎপরতা যদি সত্যিকার অর্থে সংগঠন পুনর্গঠনের জন্য হয়, তাহলে তার প্রথম প্রকাশ হওয়া উচিত তৃণমূলের কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন, বিপদে পড়া সহকর্মীদের পাশে দাঁড়ানো, পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং সাংগঠনিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।
শুধু বক্তৃতায় সাহসের পরিচয় দেওয়া যায় না; কাজের মধ্য দিয়েই রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রমাণ দিতে হয়।
নেতৃত্বের পদ আছে, কিন্তু কর্মীদের জন্য দরজা খোলা তো?
সাংগঠনিক সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বিভিন্ন ইউনিটে নেতৃত্বের সঙ্গে তৃণমূলের কর্মীদের যোগাযোগের সুযোগ কতটা উন্মুক্ত। একটি রাজনৈতিক দলের ইউনিট কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব কেবল পদ ধারণ করা নয়। তাঁদের অন্যতম দায়িত্ব হলো সংগঠনের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীকে সঙ্গে রাখা, মতবিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং যোগ্যতা ও অবদানের ভিত্তিতে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা।
কিন্তু বিভিন্ন পর্যায়ে এমন অভিযোগ শোনা যায় যে, কোনো কোনো নেতা নিজেদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নিয়ে আলাদা বলয় গড়ে তুলছেন। টেলিগ্রাম বা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে পরিচিত ও অনুগতদের যুক্ত করা হলেও দীর্ঘদিনের ত্যাগী কর্মীদের বাইরে রাখা হচ্ছে। কোথাও কোথাও ব্যক্তিগত অনুসারীদের প্রাধান্য দিয়ে সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের অভিযোগও রয়েছে।
এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যেমন সমীচীন নয়, তেমনি সাংগঠনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়াও দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়।
বিশেষ করে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের আওতাধীন মীরসরাই উপজেলা নিয়ে তৃণমূলের বিভিন্ন পর্যায়ে যে অসন্তোষের কথা আলোচনায় আসে, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। মীরসরাইয়ের মতো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সংগঠনের শক্তি নির্ভর করে ইউনিয়ন, ওয়ার্ড ও গ্রাম পর্যায়ের কর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর। সেখানে যদি ব্যক্তিগত বলয়, যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা কিংবা অনুসারীনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি প্রাধান্য পায়, তাহলে সংগঠনের ঐক্য ও সাংগঠনিক সুক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
মীরসরাইয়ের রাজনীতিতে যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও আদর্শিক অবস্থান ধরে রেখেছেন এবং ব্যক্তিগত সুবিধার চেয়ে সাংগঠনিক দায়িত্বকে প্রাধান্য দিয়েছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। কোনো নেতা বা গোষ্ঠীর প্রতি আনুগত্যের ভিত্তিতে নয়, বরং কর্মীর অবদান, যোগ্যতা, গ্রহণযোগ্যতা ও সাংগঠনিক নিষ্ঠার ভিত্তিতে মূল্যায়নের পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
রাজনৈতিক সংগঠনের গ্রুপ বা যোগাযোগমাধ্যম কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এগুলো সাংগঠনিক যোগাযোগের মাধ্যম। সেখানে মতভিন্নতা থাকলেও সংশ্লিষ্ট নেতা-কর্মীদের যুক্তিসংগত অংশগ্রহণের সুযোগ থাকা উচিত। অন্যথায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মও সংগঠনের ঐক্য প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে বিভাজনের হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে।
কমিটি পুনর্গঠনে ব্যক্তিগত বলয় নয়, প্রয়োজন স্বচ্ছতা
একটি রাজনৈতিক দলের কমিটি পুনর্গঠন স্বাভাবিক সাংগঠনিক প্রক্রিয়া। সময়ের পরিবর্তন, কর্মীদের সক্রিয়তা, সাংগঠনিক প্রয়োজন এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে নেতৃত্বে পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া যদি স্বচ্ছ না হয়, যদি তৃণমূলের মতামত উপেক্ষিত হয় কিংবা ব্যক্তিগত আনুগত্যকে যোগ্যতার বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে তা নতুন করে অসন্তোষ তৈরি করবে।
কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, যাঁরা দীর্ঘদিন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত এবং প্রতিকূল সময়ে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁদের অবদান বিবেচনায় নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নেতৃত্ব নির্বাচনে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, আর্থিক প্রভাব কিংবা গোষ্ঠীগত আনুগত্যের পরিবর্তে সাংগঠনিক যোগ্যতা, গ্রহণযোগ্যতা ও কর্মদক্ষতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
তৃতীয়ত, কোনো ইউনিটে নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ বা অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। একতরফা সিদ্ধান্তের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে হবে।
চতুর্থত, কমিটি পুনর্গঠনের নামে ত্যাগী কর্মীদের বাদ দেওয়া কিংবা তাঁদের মতামত প্রকাশের সুযোগ সংকুচিত করা হলে তার সাংগঠনিক ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন।
পঞ্চমত, নতুনদের অন্তর্ভুক্তি ও পুরোনোদের অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটাতে হবে। কারণ একটি রাজনৈতিক দল কেবল অতীতের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে এগোতে পারে না, আবার অভিজ্ঞ ও পরীক্ষিত কর্মীদের উপেক্ষা করেও টেকসই সংগঠন গড়ে তুলতে পারে না।
এই নীতিগুলো বাস্তবায়িত হলে সাংগঠনিক বিরোধ কমবে, পারস্পরিক আস্থা বাড়বে এবং কর্মীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ আরও সুদৃঢ় হবে।
ঐক্যের কথা বললেই ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয় না
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্যের আহ্বান নতুন কিছু নয়। কিন্তু ঐক্য কেবল বক্তৃতা, স্লোগান কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে প্রতিষ্ঠিত হয় না। ঐক্যের জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ন্যায়সংগত আচরণ, মতপ্রকাশের সুযোগ এবং সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণের অধিকার।
যে কর্মী দুঃসময়ে সংগঠনের পাশে ছিলেন, তাঁর প্রতি অবজ্ঞা দেখিয়ে ঐক্যের আহ্বান জানানো হলে সেই আহ্বান বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। যাঁরা বছরের পর বছর সংগঠনের জন্য শ্রম দিয়েছেন, তাঁদের বাদ দিয়ে কেবল ব্যক্তিগত অনুসারীদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হলে সাংগঠনিক ঐক্যের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
আবার ব্যক্তিগত ক্ষোভ কিংবা পদ না পাওয়ার অভিমান থেকে সংগঠনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াও দায়িত্বশীল রাজনীতির পরিচয় নয়। ত্যাগী কর্মীদেরও সংগঠনের বৃহত্তর স্বার্থ, শৃঙ্খলা ও আদর্শকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে নেতৃত্বের দায়িত্ব হলো তাঁদের অভিমান, অভিযোগ ও বঞ্চনার কথা শোনা এবং ন্যায়সংগত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া।
ঐক্য মানে সবাইকে একই ব্যক্তির অনুসারী হতে হবে, এমন নয়। ঐক্য মানে অভিন্ন আদর্শ ও সাংগঠনিক নীতির ভিত্তিতে ভিন্নমতকে ধারণ করে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাওয়া। ব্যক্তিকেন্দ্রিক আনুগত্যের পরিবর্তে আদর্শকেন্দ্রিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই সংগঠন প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী হবে।
আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আত্মসমালোচনা ও পুনর্গঠনের ওপর
আওয়ামী লীগের ইতিহাস যেমন গৌরবের, তেমনি সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ারও অনেক বিষয় রয়েছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার সময় অর্জন যেমন ছিল, তেমনি সাংগঠনিক দুর্বলতা, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সুবিধাবাদী রাজনীতির অভিযোগও দলকে রাজনৈতিকভাবে বিব্রত করেছে। এসব বিষয়ে আত্মসমালোচনা ছাড়া ভবিষ্যতের জন্য কার্যকর সাংগঠনিক ভিত্তি নির্মাণ সম্ভব নয়।
দলের পুনর্গঠন মানে শুধু পুরোনো কাঠামো ফিরিয়ে আনা নয়; বরং কোথায় ভুল হয়েছে, কেন তৃণমূলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, কীভাবে সুবিধাবাদীরা প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেয়েছে এবং কেন সাংগঠনিক জবাবদিহি দুর্বল হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে হলে জনগণের আস্থা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, আইনের শাসন, জবাবদিহি এবং মানুষের অধিকারকে গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো রাজনৈতিক দলের ঐতিহাসিক অবদান বর্তমানের প্রতিটি কর্মকাণ্ডকে প্রশ্নাতীত করে না। বরং ঐতিহাসিক ঐতিহ্য যত সমৃদ্ধ, বর্তমানের দায়িত্বও তত বেশি।
শেখ হাসিনা কিংবা আওয়ামী লীগের প্রতি আনুগত্যের প্রকৃত অর্থও কেবল স্লোগান দেওয়া নয়। দলের আদর্শ, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন এবং জনগণের কল্যাণের প্রশ্নে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করাই হওয়া উচিত সেই আনুগত্যের মূল পরিচয়।
কেউ যদি দলীয় পরিচয়কে ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের উপায় হিসেবে ব্যবহার করেন, তৃণমূলের কর্মীদের উপেক্ষা করেন কিংবা সাংগঠনিক কাঠামোকে ব্যক্তিগত বলয়ে পরিণত করেন, তাহলে তাঁর কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা দলবিরোধিতা নয়; বরং সংগঠনকে সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয় অংশ।
শেষ কথা: দুঃসময়ের কর্মীদের মূল্যায়নই হোক পুনর্গঠনের প্রথম শর্ত
আওয়ামী লীগ আজ যে রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেখানে দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা আলোচনা, প্রত্যাশা ও উদ্বেগ রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া।
যাঁরা দুঃসময়ে সংগঠনের পাশে ছিলেন, তাঁদের অবদানকে স্বীকৃতি দিতে হবে। যাঁরা নতুন করে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হতে চান, তাঁদেরও আদর্শ, যোগ্যতা ও দায়িত্বশীলতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে। কাউকে শুধু পুরোনো বলে অগ্রাধিকার দেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি কাউকে নতুন বলে সন্দেহের চোখে দেখা কিংবা ব্যক্তিগত আনুগত্যের ভিত্তিতে কাউকে গ্রহণ-বর্জন করাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
রাজনীতিতে পদ-পদবি সাময়িক, কিন্তু মানুষের আস্থা ও সাংগঠনিক অবদান দীর্ঘস্থায়ী। যে কর্মী প্রতিকূল সময়ে সহকর্মীর পাশে দাঁড়ান, সংগঠনের জন্য শ্রম দেন এবং ব্যক্তিগত সুবিধার চেয়ে আদর্শকে গুরুত্ব দেন, তিনিই সংগঠনের প্রকৃত সম্পদ।
আওয়ামী লীগ যদি সত্যিকার অর্থে পুনর্গঠনের পথে এগোতে চায়, তাহলে ‘আমিলীগ’ সংস্কৃতির অভিযোগগুলোকে অবজ্ঞা না করে সেগুলোর নিরপেক্ষ পর্যালোচনা করতে হবে। ব্যক্তিগত বলয় ভেঙে সাংগঠনিক পরিসর উন্মুক্ত করতে হবে। কমিটি গঠনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। ত্যাগী কর্মীদের সম্মান দিতে হবে এবং নেতৃত্বকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
কারণ, একটি রাজনৈতিক দল কেবল তার নেতাদের কারণে টিকে থাকে না; টিকে থাকে সেই অসংখ্য কর্মীর শ্রম, ত্যাগ, বিশ্বাস ও ভালোবাসায়, যাঁরা কোনো পদ-পদবির নিশ্চয়তা ছাড়াই সংগঠনের পাশে থাকেন।
বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম থেকে জন্ম নিয়েছিল। সেই ঐতিহ্য ধারণ করতে হলে ব্যক্তিস্বার্থের রাজনীতি নয়, আদর্শের রাজনীতিকেই প্রাধান্য দিতে হবে। আর সেই পথের প্রথম শর্ত—দুঃসময়ের পরীক্ষিত কর্মীদের অবহেলা নয়, যথাযথ মূল্যায়ন; ব্যক্তিগত বলয় নয়, সাংগঠনিক ঐক্য; বড় বড় প্রতিশ্রুতি নয়, দায়িত্বশীল কর্মকাণ্ড।
আওয়ামী লীগের সামনে আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—দল কি আবারও সুবিধাবাদী বলয়ের কাছে জিম্মি হবে, নাকি আত্মসমালোচনা ও সাংগঠনিক সংস্কারের মধ্য দিয়ে তার প্রকৃত কর্মী ও জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে দলটির ভবিষ্যৎ পথচলার অনেকখানি।
লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
