মীরসরাই ট্র্যাজেডির ১৫ বছর আজ
মোহাম্মদ হাসান:
আজ ১১ জুলাই। মীরসরাই ট্র্যাজেডির ১৫ বছর। ক্যালেন্ডারে দিনটি ফিরে এলেই মীরসরাইয়ের আকাশ-বাতাস যেন আবারও ভারী হয়ে ওঠে কান্না, আর্তনাদ আর স্বজনহারাদের বুকফাটা আহাজারিতে। সময়ের হিসেবে পনেরো বছর পেরিয়ে গেলেও সেই বিভীষিকাময় দিনের ক্ষত আজও শুকায়নি। কারও আদরের সন্তান, কারও ভাই, কারও বন্ধু, কারও সহপাঠী কিংবা প্রিয় শিক্ষার্থীদের অকালে হারানোর বেদনা আজও তাড়া করে ফেরে অসংখ্য মানুষকে।
আবুতোরাব, মায়ানী, মঘাদিয়া—পুরো জনপদ যেন এখনো বহন করে সেই শোকের ভার। গভীর রাতে অনেকের কানে আজও যেন ভেসে আসে স্বজন হারানোর আর্তচিৎকার। স্মৃতি বলতে এখন কেবল দেয়ালে ঝোলানো কিছু ছবি। সন্তানহারা মা-বাবা সেই ছবিগুলো বুকে জড়িয়ে কখনো অশ্রু ঝরান, কখনো আবার নীরবে তাকিয়ে থাকেন—নিঃশব্দ, নির্বাক।
জানা যায়, ২০১১ সালের ১১ জুলাই চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত বঙ্গবন্ধু-বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টের খেলা দেখে বাড়ি ফিরছিল একদল শিক্ষার্থী। বড়তাকিয়া-আবুতোরাব সড়কের সৈদালী এলাকায় চালকের অসতর্কতায় শিক্ষার্থীবাহী একটি মিনি ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাশের ডোবায় উল্টে পড়ে। মুহূর্তেই নিভে যায় ৪৫টি তাজা প্রাণ। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ৪৩ জন শিক্ষার্থী। সেই দুর্ঘটনায় লাশের মিছিল নেমেছিল গ্রামে গ্রামে। মুহূর্তেই শোকের জনপদে পরিণত হয়েছিল মায়ানী, আবুতোরাব, মঘাদিয়াসহ আশপাশের সাতটি গ্রাম।
দুর্ঘটনাস্থলের পাশ দিয়ে আজও কেউ গেলে বুকের ভেতর কেঁপে ওঠে। স্থানীয়দের কাছে জায়গাটি শুধু একটি সড়ক নয়, এটি এক বেদনাবিধুর স্মৃতির প্রতীক। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলেছে, কিন্তু স্বজন হারানোর সেই শোক বদলায়নি।
সেদিন নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে ছুটে এসেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং বিকল্পধারা বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ. কিউ. এম. বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
স্মৃতির নীরব সাক্ষী ‘আবেগ’ ও ‘অন্তিম’
নিহত শিক্ষার্থীদের স্মৃতি অম্লান রাখতে আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রবেশমুখে নির্মাণ করা হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ ‘আবেগ’ এবং দুর্ঘটনাস্থলে স্থাপন করা হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ ‘অন্তিম’। আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীই সবচেয়ে বেশি নিহত হওয়ায় ২০১২ সালে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে নির্মিত হয় ‘আবেগ’। সেখানে নিহত শিক্ষার্থীদের ছবি সংরক্ষণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, দুর্ঘটনাস্থলের স্মৃতিচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ‘অন্তিম’, যা প্রতিদিনই স্মরণ করিয়ে দেয় সেই ভয়াল দিনের কথা।
আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মর্জিনা আক্তার জানান, মীরসরাই ট্র্যাজেডিতে নিহত শিক্ষার্থীদের স্মরণে আজ সকালে কোরআন খতম, সকাল ১০টায় স্মৃতিস্তম্ভ ‘আবেগ’ ও ‘অন্তিম’-এ পুষ্পস্তবক অর্পণ, সকাল সাড়ে ১১টায় বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল এবং তবারুক বিতরণের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবার, দুর্ঘটনায় আহত শিক্ষার্থী, বর্তমান শিক্ষার্থী, শিক্ষক, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং মীরসরাইয়ের সংসদ সদস্য নুরুল আমিন উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
উল্লেখ্য
২০১১ সালের ১১ জুলাইয়ের সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের ৩৪ জন, আবুতোরাব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪ জন, আবুতোরাব ফাজিল মাদরাসার ২ জন এবং প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধুরী কলেজের ২ জন শিক্ষার্থী প্রাণ হারান। এছাড়া একজন অভিভাবক ও দুইজন ফুটবলপ্রেমীও সেদিন নিহত হন।
পনেরো বছর পেরিয়ে গেলেও মীরসরাই ট্র্যাজেডি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় বেদনার নাম। সময় হয়তো ক্ষতকে কিছুটা মলিন করে, কিন্তু ১১ জুলাই এলেই আবারও জেগে ওঠে সেই শোক, সেই কান্না, সেই অপূরণীয় শূন্যতা। নিহত ৪৫ প্রাণের স্মৃতি আজও বেঁচে আছে মানুষের হৃদয়ে, আর তাদের স্মরণেই নত হয় পুরো মীরসরাই।
