জেলহত্যা: কারাগারের অন্ধকারে নিভে যায় চারটি প্রজ্ঞার প্রদীপ- মোহাম্মদ হাসান
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গভীর শোক, বেদনা ও বিশ্বাসঘাতকতার কালো অধ্যায়। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের নিরাপদ আশ্রয়কেও সেদিন রক্তাক্ত করে হত্যা করা হয়েছিল জাতীয় চার নেতাকে—সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামানকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মাত্র ৮০ দিনের মাথায় সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ড ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আরেকটি ভয়াবহ আঘাত।
কেন হত্যা করা হয়েছিল জাতীয় চার নেতাকে? ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহ, গবেষকদের বিশ্লেষণ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তা হলো—এটি কেবল চারজন রাজনীতিবিদকে হত্যা নয়; বরং মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভিত্তি এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক বিকল্পকে নিশ্চিহ্ন করার এক নির্মম প্রচেষ্টা।
১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর দেশ যখন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সামরিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে বিপর্যস্ত, তখন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের বড় একটি অংশ কারাগারে কিংবা আত্মগোপনে। রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সেনাবাহিনীর ভেতরে চলছিল তীব্র টানাপোড়েন। ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল—রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে জাতীয় চার নেতাই আবার রাষ্ট্র পরিচালনা কিংবা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারেন।
গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সম্ভাব্য এমন রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের আশঙ্কা থেকেই চার নেতাকে হত্যার পরিকল্পনা হয়ে থাকতে পারে। ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেনের পর্যবেক্ষণেও উঠে এসেছে, পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটলে আওয়ামী লীগ যাতে নেতৃত্বের সংকটে পড়ে, সে উদ্দেশ্যেই চার নেতাকে সরিয়ে দেওয়ার চিন্তা করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
৩ নভেম্বর মধ্যরাতে সশস্ত্র সেনাসদস্যরা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশ করে। কারা কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে রাষ্ট্রপতির নির্দেশের কথা জানিয়ে চার নেতাকে একত্র করা হয়। এরপর কারাগারের অভ্যন্তরেই চালানো হয় বর্বর হত্যাযজ্ঞ। জেলার আমিনুর রহমানের প্রত্যক্ষদর্শী বর্ণনায় উঠে এসেছে সেই ভয়াবহ মুহূর্তের বিবরণ। তাজউদ্দীন আহমদ তখন পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করছিলেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম হাত-মুখ ধুয়েছিলেন। ক্যাপ্টেন মনসুর আলী কাপড় পরিবর্তন করেছিলেন। তাঁরা কেউ জানতেন না, জীবনের শেষ মুহূর্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।
একটি রাষ্ট্রের কারাগার, যেখানে বন্দির জীবন ও নিরাপত্তার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, সেই কারাগারেই রাষ্ট্রের চার শ্রেষ্ঠ সন্তানকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। এর চেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতা আর কী হতে পারে!
এই চার নেতা কেবল আওয়ামী লীগের শীর্ষ রাজনীতিবিদ ছিলেন না। মুক্তিযুদ্ধের কঠিন সময়ে তাঁরা ছিলেন স্বাধীনতার নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্ব দিয়ে তাঁরা মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত ও পরিচালিত করেছিলেন। তাঁদের ত্যাগ, সাহস ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে।
তাই জেলহত্যা ছিল শুধু চারটি প্রাণের বিনাশ নয়; এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতান্ত্রিক রাজনীতি এবং একটি সম্ভাবনাময় নেতৃত্বকে আঘাত করার অপচেষ্টা।
আজ জেলহত্যা দিবসে আমাদের প্রশ্ন—যাঁরা স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখেছিলেন, তাঁদের কেন স্বাধীন দেশের কারাগারে জীবন দিতে হলো? কেন রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দেয়াল ভেদ করে হত্যাকারীরা এমন নৃশংসতা চালানোর সুযোগ পেল? এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, নির্দেশদাতা ও পরিকল্পনাকারীদের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ঐতিহাসিক সত্য প্রতিষ্ঠা কতটা নিশ্চিত হয়েছে?
ইতিহাসের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। জাতীয় চার নেতার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা শুধু ফুলেল শুভেচ্ছা কিংবা আনুষ্ঠানিক স্মরণে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। তাঁদের আদর্শ, সততা, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগকে ধারণ করতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা।
৩ নভেম্বর আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ক্ষমতার দ্বন্দ্ব যখন বিবেককে গ্রাস করে, তখন রাষ্ট্রের সবচেয়ে নিরাপদ স্থানও মৃত্যুকূপে পরিণত হতে পারে। জাতীয় চার নেতার রক্তস্নাত স্মৃতি তাই শুধু অতীতের শোক নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক কঠিন সতর্কবার্তা।
জাতীয় চার নেতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। তাঁদের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে।
লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
