ফ্যাসিস্ট তকমার রাজনীতি: আয়নার সামনে দাঁড়াতে প্রস্তুত কে? -মোহাম্মদ হাসান
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক তৈরি করেছিল। মানুষের প্রত্যাশা ছিল, পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির অবসান ঘটবে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় প্রভাবমুক্ত হবে এবং গণতন্ত্র নতুন ভিত্তি পাবে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সংসদে এসেছে, আর নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছে। কিন্তু ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও রাজনৈতিক সংস্কৃতির কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন কতটা হয়েছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক বিতর্কে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দগুলোর একটি ‘ফ্যাসিস্ট’। বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে জামায়াত ও এনসিপির পক্ষ থেকে স্বৈরাচারী প্রবণতা এবং ফ্যাসিবাদী রাজনীতির অভিযোগ উঠছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কখনো ফ্যাসিস্ট, কখনো ফ্যাসিবাদের সহযোগী কিংবা পুরোনো শাসনের উত্তরসূরি হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কাউকে ফ্যাসিস্ট বললেই কি সে ফ্যাসিস্ট হয়ে যায়? নাকি তার রাজনৈতিক আচরণ, ক্ষমতা প্রয়োগের ধরন, বিরোধী মতের প্রতি মনোভাব এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার পদ্ধতি দিয়েই এই পরিচয় নির্ধারিত হওয়া উচিত?
ফ্যাসিবাদ কোনো সাধারণ রাজনৈতিক গালাগাল নয়। এটি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রবণতা, যার বৈশিষ্ট্য হলো ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, ভিন্নমত দমন, রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার এবং বিরোধীদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা। সুতরাং কোনো দলকে ফ্যাসিবাদী বলার আগে তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, প্রমাণ ও রাজনৈতিক আচরণ বিশ্লেষণ করা জরুরি।
তবে বিএনপির ক্ষেত্রেও একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন—অতীতের কোনো সরকারের সঙ্গে তুলনা করে বর্তমান সরকারের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসা মানেই জনগণের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার অবাধ লাইসেন্স পাওয়া নয়। বরং নির্বাচনী বিজয় সরকারের দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সভা-সমাবেশের অধিকার, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা এবং প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা সরকারের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব। স্থানীয় পর্যায়ে দখলদারত্ব, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক সহিংসতা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। বিএনপির বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদের অভিযোগ তোলার আগে দলটিকে নিজের ইতিহাস, রাজনৈতিক দর্শন ও সাংগঠনিক সংস্কৃতির মুখোমুখি হতে হবে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে দলটির তৎকালীন রাজনৈতিক অবস্থান, আলবদর বাহিনীর ভূমিকা, যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং অতীতের রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগ বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এসব প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে কেবল অন্যের গণতান্ত্রিক বিচ্যুতি নিয়ে কথা বললে রাজনৈতিক নৈতিকতার দাবি দুর্বল হয়ে পড়ে।
নারীর অধিকার, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়েও জামায়াতকে সুস্পষ্ট অবস্থান জানাতে হবে। নির্বাচনী বক্তব্যে সমানাধিকারের প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তব সাংগঠনিক চর্চার মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা জরুরি। একটি বহুত্ববাদী রাষ্ট্রে নাগরিকের অধিকার ধর্ম, লিঙ্গ কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত হতে পারে না।
এনসিপির সামনেও রয়েছে বড় পরীক্ষা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ছিল বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। সেই আন্দোলনের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার দাবি করলেই কোনো দল সমালোচনার ঊর্ধ্বে চলে যায় না। রাজনৈতিক অবস্থান, জোট, নেতৃত্বের আচরণ এবং ক্ষমতার প্রশ্নে তাদের প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নও একইভাবে পর্যালোচিত হতে হবে। জুলাইয়ের চেতনা কোনো দলের একক সম্পত্তি নয়; এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এখানেই বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট। প্রত্যেক দল অন্যের অতীতের ভুল মনে রাখতে চায়, কিন্তু নিজের অতীতের ভুলের জবাব দিতে অনাগ্রহী। ক্ষমতায় থাকলে বিরোধিতাকে ষড়যন্ত্র মনে হয়, বিরোধী দলে থাকলে সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে স্বৈরাচারী মনে হয়। অথচ গণতন্ত্রে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী—উভয় পক্ষেরই দায়িত্ব রয়েছে। বিরোধী দলের কাজ সরকারের সমালোচনা করা, কিন্তু সেই সমালোচনার ভিত্তি হতে হবে তথ্য, যুক্তি ও দায়িত্বশীলতা। একইভাবে সরকারের দায়িত্ব বিরোধী মতকে দমন নয়, বরং সহ্য ও সুরক্ষা দেওয়া।
রাজনীতির এই অসুস্থ প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় শিকার তরুণ প্রজন্ম। যারা জুলাইয়ে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিল, তারা এখন রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণ পর্যবেক্ষণ করছে। তারা যদি দেখে ক্ষমতার পালাবদল হচ্ছে, কিন্তু দখলদারত্ব, প্রতিহিংসা, দুর্নীতি ও সহিংসতার সংস্কৃতি বদলাচ্ছে না, তাহলে রাজনীতির প্রতি তাদের অনাস্থা আরও বাড়বে। রাষ্ট্রের জন্য এটি কোনোভাবেই শুভ লক্ষণ নয়।
রাজনীতি হওয়া উচিত ত্যাগ, সততা, নৈতিকতা ও জনসেবার জায়গা। কিন্তু সেটি যখন অর্থ, পেশিশক্তি ও ব্যক্তিস্বার্থ অর্জনের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন ভালো ও আদর্শবান মানুষের জন্য রাজনীতিতে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। এই সংস্কৃতি ভাঙতে না পারলে শুধু সরকার পরিবর্তন করে গণতন্ত্রের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।
অতএব, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন কে কাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলছে, তা নয়। বরং কে ক্ষমতার অপব্যবহার করছে, কে বিরোধী মতকে দমন করছে, কে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করছে এবং কে নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে—সেই হিসাব জনগণের সামনে তুলে ধরা।
বিএনপিকে তার বর্তমান শাসনের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। জামায়াতকে তার ইতিহাস, আদর্শ ও রাজনৈতিক অবস্থানের ব্যাখ্যা দিতে হবে। এনসিপিকেও তাদের প্রতিশ্রুতি ও কর্মকাণ্ডের সামঞ্জস্য প্রমাণ করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রমাণ প্রতিপক্ষকে ফ্যাসিস্ট আখ্যা দেওয়া নয়; বরং নিজের আচরণে গণতন্ত্র, সহনশীলতা, ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকারের চর্চা প্রতিষ্ঠা করা।
রাজনীতিতে আয়না সবার সামনেই থাকা উচিত। যে দল অন্যের মুখে ফ্যাসিবাদের ছাপ খুঁজছে, তাকে একবার নিজের মুখটিও আয়নায় দেখা প্রয়োজন। কারণ গণতন্ত্রে কোনো রাজনৈতিক দলই নৈতিকতার একচ্ছত্র মালিক নয়। শেষ পর্যন্ত জনগণই বিচার করবে—কে ক্ষমতার রাজনীতি করেছে, আর কে সত্যিকার অর্থে মানুষের রাজনীতি করেছে।
লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
সংশ্লিষ্ট সংবাদ
ডেঙ্গু-হামের থাবা: মৃত্যুর মিছিল থামাতে ব্যর্থতা কার?- মোহাম্মদ হাসান
বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। ডেঙ্গু ও হামের সংক্রমণ যেন একসঙ্গে চেপে বসেছেআরো পড়ুন
